মবের উল্লাস ও আইনের শাসন: শাঁখের করাতে পুলিশ

বিডি নিউজ ২৪ আগৈলঝাড়া ফজিলাতুন নেসা শাপলা প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৩

“ভাই, আমি তো আপনাদেরই ঘরের সন্তান। আমার কী দোষ?”


উন্মত্ত জনতার লাঠিসোঁটার মুখে হাতজোড় করা রক্তাক্ত পুলিশ সদস্যের আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ৯ জুলাই রাত থেকে। দৃশ্যগুলো সাধারণ মানুষের মুঠোফোনে ঘুরছিল। তাৎক্ষণিকভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত জানা না গেলেও, ১০ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ) তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। বিবৃতির সূত্রে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায়।


থানায় পুলিশ হেফাজতে আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। হামলায় পুলিশসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। সংগঠনটি ঘটনাটিকে দেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতির’ বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৮ জুলাই সন্ধ্যায় আগৈলঝাড়া থানা-পুলিশ চুরির মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে (২৬) গ্রেপ্তার করে। রিয়াজ মাদকাসক্ত ছিলেন। থানাহাজতে থাকাকালে তিনি নিজের মাথায় আঘাত করে জখম হন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতে তাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৯ জুলাই দুপুরে রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে দলবদ্ধ লোক আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর ও কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালায়।


ভিডিওতে আমরা হামলার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছি। কনস্টেবলের হাতজোড় করা আকুতি উগ্র জনতার বধির কান শোনেনি, অন্ধ চোখ দেখতে পায়নি। বিকেলে পরিস্থিতি শান্ত হলে পিচঢালা রাস্তায় পড়ে রইল শুধু ভাঙা কাচ, পোড়া গাড়ির কঙ্কাল আর রক্তের দাগ।


পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ থাকতেই। ক্ষোভ থাকা কোনো অন্যায় নয়। বিগত দিনগুলোয় পুলিশের কর্মকাণ্ড মানুষ ভুলে যাবে কি না, সেই প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের ধরন সমাজকে আদিম যুগে নিয়ে গেলে ক্ষতি সবার। পুলিশের মতো সশস্ত্র বাহিনীর ওপর এমন হামলার সময় তারা কেন চুপ থাকে, কেন নিজেদের বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় না, সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। এখানেই লুকিয়ে আছে নির্মম সত্য। আমাদের দেশের পুলিশ আসলে ভেতর থেকে ‘হাত-পা বাঁধা’ বাহিনী, যা আজকের সমাজ গোচরেই আনছে না।


দশকের পর দশক পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার করার চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনেরা পুলিশকে ব্যবহার করেছে প্রতিপক্ষ দমনে। শুধু গত সতেরো বছর নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করেছে এমন নয়, এ দেশে যখনই যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, পুলিশ তাদের অনুগত থেকেছে। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে তারা ‘নিরাপত্তা রক্ষাকারী’র চেয়ে ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।


ওপর মহলের নির্দেশ অমান্যের ক্ষমতা সাধারণ কনস্টেবল বা ওসির থাকে না। চাকরি বাঁচানো ও পরিবারের মুখে অন্ন জোগানোর তাগিদে আদেশ মানতে তারা বাধ্য হন। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় নীতিনির্ধারণি ভূমিকাহীন মাঠপর্যায়ের সাধারণ পুলিশ সদস্যদেরই পুরো বাহিনীর ভুলের মাশুল দিতে হয়। অথচ তারা শুধুই চাকরি করেন ও বিধির প্রতি অনুগত থাকেন। থানার কনস্টেবল কিংবা ট্রাফিক পুলিশ কত বেতন বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান, তা কেউ খতিয়ে দেখে না।


বিগত দিনগুলোর অতি-রাজনীতিকরণ এবং চব্বিশ-পরবর্তী ঢালাও সহিংসতা ও বিচারহীনতার কারণে পুলিশের নৈতিক মনোবল এখন তলানিতে। রাজনীতিকরণ এখনো বন্ধ হয়নি। পুলিশ বাহিনী ক্ষমতাসীন সরকারের হয়েই কাজ করছে, মাঝখান থেকে সদস্যরা ভুগছেন দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে জনগণের তীব্র ক্ষোভ, অন্যদিকে আইনি সুরক্ষার অভাব।


সুযোগসন্ধানী মানুষ নিজেদের সুবিধা হাসিলে নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মব তৈরি করছে। পুলিশ মব ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। ভীতি পুলিশ সদস্যদের সিদ্ধান্তহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আত্মরক্ষা করবে নাকি মার খাবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।


পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কোনো সরকার আন্তরিকভাবে করেনি। রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে ওঠার মতো স্বাধীন আইনি কাঠামো তাদের দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রের কাছে আইনি হাত-পা বাঁধা থাকায় তারা স্বাধীনভাবে জনবান্ধব হতে পারেনি। জনগণের ক্ষোভের মুখে রাষ্ট্রও সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও