অশ্লীলতার মহামারী: বাংলা ভাষার সভ্য কাঠামো ধ্বংস হচ্ছে

বিডি নিউজ ২৪ বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০২

সভ্যতার অভ্যন্তরীণ পচনের লক্ষণ


ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সভ্যতার আত্মা, তার অহংকার, তার অস্তিত্বের সনদ। একটি সভ্য সমাজ বা জাতির সমস্ত প্রজ্ঞা—তার ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, আইন, ধর্মবিশ্বাস, চিকিৎসাবিদ্যা, কৃষি ও বাস্তুবিদ্যা—সবকিছুই তার ভাষায় সঞ্চিত থাকে। ঐতিহাসিক অ্যাডওয়ার্ড গিবনের মতে, রোমান সভ্যতার পতনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল নৈতিক অবক্ষয়। উচ্চবিত্ত সমাজ থেকে সাধারণ জনগণের ভাষায় অশ্লীলতা, জীবনযাপনে বিলাসিতা এবং আদর্শের অভাব দেখা দিয়েছিল। এটি সমাজের সংহতি ও নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল, যা বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। বাংলা ভাষার বুকে অশ্লীলতার যে কালি ঢালা হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে একদিন হয়তো আমাদেরও সেই করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে—যেখানে আমাদের ভাষা থাকবে, কিন্তু তার মর্যাদা, তার সভ্য চেহারা, তার আত্মা—সবই হারিয়ে যাবে।


অথচ বাংলা ভাষা আমাদের অহংকার। বাংলা ভাষার ভিত্তিতেই আমাদের জাতীয়তার পরিচয়। এ ভাষায় দেহতত্ত্ব নিয়ে গান করে লালন ফকির বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অমূল্য সম্পদে সমৃদ্ধ করেছেন;


‘আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা,


মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।


তার উপরে সদর কোঠা,


আয়নামহল তায়।


খাঁচার ভিতর অচিন পাখি


কমনে আসে যায়।’


চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের সহজিয়া বৈষ্ণব, যোগী সম্প্রদায়ের গান, বাউল, মারফতি, ফকিরি, রামপ্রসাদের শাক্ত গান ইত্যাদি গানে দেহসাধনার কথা শৈল্পিক সৌন্দর্য নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে। পাগলা কানাই গাইছেন, ‘আমার এই দেহ-নদী চলতে ভারি, বাঁধলে নদীর বাঁধ মানে না, নদীর জল শুকাইল চর পড়িল, তবু নদীর বেগ গেল না’। রবীন্দ্রনাথ এ ভাষায় ‘সভ্যতার’ সুর বেঁধেছেন, নজরুল এ ভাষায় ‘বিদ্রোহের’ আগুন জ্বেলেছেন, সব অশ্লীলতাকে বর্জন করেই। সেই ভাষার বুকে আজ অভূতপূর্ব কলঙ্কের গাঢ় আঁচড় বসিয়ে দিচ্ছে একদল ‘আধুনিক’ প্রজন্ম। ২০২৪ সালের ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক ভাষায় দেহতত্ত্বের যে অশ্লীল বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা বাঙালি সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে অপদস্ত করছে, আমাদের সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।


বিবর্তন নয়, বিকৃতি: ডিজিটাল মাধ্যমের ছদ্মবেশ


ভাষা কখনো স্থির থাকে না; সময়, সমাজ ও প্রযুক্তির স্পন্দনে তা বদলায়। ভাষাকে ব্যাকরণের আলোকে যতই দেখা হোক, জনপরিসরে ব্যবহারের সময় ভাষা বদলাবেই—এটাই ভাষার বেঁচে থাকার শর্ত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের মাতৃভাষার যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল, একুশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝিতে এসে সে ভাষা তার মর্যাদা হারাতে বসবে বা সভ্য কাঠামো খোয়াতে থাকবে। বাংলা ভাষা এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিবর্তনের মুখোমুখি। ফেইসবুক, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম যেমন ভাষার চেহারা বদলে দিচ্ছে, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন ভাষার ব্যবহারে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।


ফেইসবুক বা টিকটককে যদি ভাষার ‘বিবর্তনের’ হাতিয়ার বলা হয়, তবে সেই যুক্তি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বিবর্তন মানে উন্নতি, পরিশীলন ও গভীরতা; কিন্তু এই মাধ্যমগুলো বাংলা ভাষায় যা এনেছে, তা হলো সংক্ষিপ্ততা ও রূঢ়তার বিষবাষ্প। ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ ও ‘রিলস’-এর গোলকধাঁধায় টাইপিংয়ের গতি হয়তো বেড়েছে, কিন্তু সে গতি বাংলা বাক্য গঠনে শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটিয়েছে এবং শব্দের পথচলাকে বেপরোয়া করেছে। সেই সুযোগে বাংলা ভাষায় এমন এমন শব্দ পাচার হয়েছে, যেগুলোর ব্যুৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না—যেমন: ‘প্যারা’ (ইংরেজি প্যারাগ্রাফ নয়), যা দিয়ে যন্ত্রণা বা ভোগান্তি বোঝানো হচ্ছে। শৃঙ্খলার অভাব ভাষার মাধুর্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; বানান ভুল এখন ‘ট্রেন্ড’ এবং অশুদ্ধ উচ্চারণ এখন ‘মজা’।


অন্যদিকে ২০২৪ সালের ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’—এই স্লোগানটি ১৯৬৯-৭১ সালের ‘বাঙালি, বাঙালি’ স্লোগানের বিকৃত রূপ। আন্দোলনের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে কেউ যখন অশ্লীল স্লোগানকে প্রতিবাদের অস্ত্র বানায়, তখন তা আন্দোলনের নৈতিক মানকে খর্ব করে। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গালাগাল, অশ্লীল শব্দ ও বিষোদগারের প্রবণতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেখানে দেহতত্ত্বের প্রয়োগ শালীনতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে।


কিন্তু এখানেই শেষ নয়; সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো—এই প্রবণতা অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। যে শব্দগুলো জনসমক্ষে উচ্চারণ করলে একসময় মানুষ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিত, সেই শব্দগুলো আজকে বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথের দেয়ালে, বঙ্গবন্ধুর বিধ্বস্ত বাড়ির দেয়ালে, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের স্মারক বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্থাপনায়, এমনকি অভিজাত শ্রেণির ফেইসবুক স্ট্যাটাসেও স্থান পাচ্ছে। ভাষার এমন চেহারা বদল নোংরামি; এই বদলকে ‘সাংস্কৃতিক আত্মহত্যা’ ছাড়া কিছু বলা যায় না। এটি মোটেই ভাষার মুক্তি নয়, স্রেফ অধঃপতন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও