জুলাই আন্দোলন : স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল
জনগণের নির্বাচিত সরকার জনগণের কথা বলবে, সবাই এটাই আশা করেন। সরকার যখন জনমতের বা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নেয়, তখন বুঝে নিতে হয়, সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আবার সরকারের পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট না থাকলে সরকার জনমতের তোয়াক্কা করে না, গোষ্ঠীস্বার্থে যা খুশি করে বেড়ায়।
আমরা ২০০৯ সাল থেকেই দেখছি ‘পলিটিক্যাল মনোপলি’র একটি বিকৃত রূপ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচনের পর যে সরকারকে আমরা দেখেছি, সেটি ছিল জনগণের ম্যান্ডেটহীন একটি অলিগার্ক। এ ধরনের অলিগার্ক যিনি বা যারা চালান, তাদের মাথায় সবসময় দুষ্ট বুদ্ধি কিলবিল করে। এ প্রসঙ্গে কল্পকথার হবুচন্দ্র রাজা আর গবুচন্দ্র মন্ত্রীর কিস্সা মনে পড়ে যায়। হবুচন্দ্র রাজার মাথায় যখন যে খেয়াল চাপে, তিনি সেটাই করে বসেন। এতে তিনি ব্যাপক বিনোদন পান। আর তার গবুচন্দ্র উজির-নাজির-কোটাল-অমাত্যরা জো হুকুম বলে হাত কচলান।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু অনেক আগে। ২০১৮ সালে ছাত্ররা দ্বিতীয় দফা কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন সরকারি চাকরিতে কোটা যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে। প্রধানমন্ত্রীর মাথায় ছিল অন্য মতলব। তিনি রাজনীতির পাকা খেলোয়াড়। সব রকম বিরোধী মত দমন করে তিনি তখন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, বেপরোয়া, ঔদ্ধত্য। কোটা সংস্কারের ধারেকাছে না গিয়ে তিনি পুরো কোটা ব্যবস্থাই তুলে দেন। এ বিষয়ে সরকার ২০২১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে। এটা ছিল এক ধরনের স্টান্টবাজি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিতে ঘোঁট পাকানোর একটা সুযোগ রেখে দেন নিজের হাতে।
এভাবে পেরিয়ে যায় আরও তিন বছর। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নামেন নতুন মতলব নিয়ে। হঠাৎ দেখা গেল, কোথা থেকে উদয় হলেন সাতজন ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’। তারা সরকারি চাকরিতে ২০২১ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। একাত্তর সালে যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাদের কারও সন্তানের সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়স আর ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল নাতিপুতিসহ বংশপরম্পরায় সরকারের দেওয়া ‘সনদধারী’ মুক্তিযোদ্ধারা কোটা ব্যবস্থার ফল ভোগ করবেন।
ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। কার্যত তারা চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জনগণের আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে একটি অনুগত সম্প্রদায় তৈরি করা ও মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া।
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি কে এম কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ সরকারের ২০২১ সালের পরিপত্র বাতিল করে কোটা পুনর্বহালের রায় দেন। হাসিনা সরকারের ইচ্ছা পূরণ হয়। সেখান থেকেই ঝামেলার শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ওই দিনই এ রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন।
সরকার তথা রাষ্ট্রপক্ষ শিক্ষার্থীদের প্রতি ছদ্ম সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য ৪ জুলাই দিন ঠিক করা হয়।
শিক্ষার্থীরা কি ততদিন বসে আঙুল চুষবেন? ১০ জুন তারা তাদের দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। ২১ জুন তারা বলে দেন, তাদের দাবি মূলত তিনটি- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কোটা রেখে পুনর্বণ্টন বা সংস্কার; চাকরির পরীক্ষায় কোটাসুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ ও কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্যপদে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। অথবা সরকারের সে সদিচ্ছা ছিল না। তারা কালক্ষেপণের পথ বেছে নেয়। বিষয়টি আদালতের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হবুচন্দ্র-গবুচন্দ্ররা গোঁফে তা দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১ জুলাই শুরু হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন। এ আন্দোলনের অনুঘটক ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এ আন্দোলনে শরিক হন। এমনকি সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের অনেকেই তাতে শামিল হন। কেননা এ আন্দোলনের মধ্যে তারা তাদের বৃহত্তর স্বার্থ দেখেছিলেন।
১৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলেন, ‘দাবি আদায়ে যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমাধানের জন্য যতগুলো পথ প্রয়োজন, তার সবই আমরা অবলম্বন করব। আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধী নই, বিরোধিতা করছি নাতিপুতি কোটার। তবে কোটার শতাংশ নিয়ে সরকারের গবেষণাভিত্তিক তথ্য থাকলে তা নিয়ে পরে আলোচনা হতে পারে।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- জুলাই বিপ্লব