আল মাহমুদের কাব্য-উপলব্ধির সীমানা

www.ajkerpatrika.com সৌভিক রেজা প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭

কবি-সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘কবিতা লেখা ব্যাপারটা আসলে জড়ের সঙ্গে চৈতন্যের সংগ্রাম, ভাবনার সঙ্গে ভাষার, ও ভাষার সঙ্গে ছন্দ, মিল, ধ্বনিমাধুর্যের এক বিরামহীন মল্লযুদ্ধ।’ অন্যদিকে দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্দ মনে করতেন যে কবি হলেন এমন একজন অসুখী জীব, যার হৃদয় গোপন যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন। আল মাহমুদের কবিতায় আমরা সেই বিরামহীন মল্লযুদ্ধ যেমন দেখতে পাই, পাশাপাশি আমরা তাঁর ব্যক্তিসত্তার মধ্যে এক যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের ছায়াকে যেন হাঁটতে দেখি। আর এই দুয়ের যৌথতায় তাঁর কবিতায় আমরা শুনতে পাই এক অনিন্দ্য সংগীত, আর সেই সংগীত কবির শৈল্পিক সমগ্রতা দিয়ে পাঠকের মনে অপার আনন্দ বয়ে আনে। যে আনন্দ আল মাহমুদের কবিতায় আধ্যাত্মিকতা অসীম অবয়বে মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের কবিতায় এমন দৃষ্টান্ত দুর্লভ বললেও খানিকটা কম বলা হয়।


কবি অরুণ মিত্র বিশ্বাস মনে করতেন যে ‘কবিতা তো জীবনেরই মতন বিচিত্র। তার সামনে মানুষ কখনো মুগ্ধ, কখনো ক্ষুব্ধ, কখনো উচ্ছ্বসিত, কখনোবা বিমূঢ়।’ আল মাহমুদ অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘প্রেম, প্রকৃতি ও স্বদেশভূমিই আমার রচনার বিষয়বস্তু।’ এর মানে এটা নয় যে তাঁর কবিতায় বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। আমরা বুঝতে পারি, একজন বড় মাপের কবির কবিতায় সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা করে দেখানো কঠিন যে তাঁর এই কবিতাটি ভালোবাসার, এই কবিতাটি স্বদেশ-প্রেমের, এই কবিতাটি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার। একজন তন্নিষ্ঠ সমালোচকের পক্ষে এমন অনিবার্য কথা একজন চলিষ্ণু কবির কবিতা সম্পর্কে বলা কঠিন। বরং বলা ভালো, সার্থক যেকোনো কবিতার মধ্যে কবির অভিজ্ঞতা থেকে আরম্ভ করে তাঁর যাবতীয় আবেগ, বোধের আলোড়ন বিচিত্রভাবে প্রকাশিত হয়। সে কারণেই একজন কবির জন্য নির্জনতা কবিতার রচনার একটি জরুরি উপাদান। জরুরি এই কারণে যে দলবেঁধে আর যা-ই হোক সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না, কবিতার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্যি। তার অর্থ আবার এটা নয় যে কবি একেবারে সমাজবিমুখ হবেন। একজন কবি হিসেবে মানুষের প্রতি বিমুখতার ব্যাপারটি আল মাহমুদ নিজেও মেনে নিতে অস্বীকার করতেন। তাঁর মতে, একজন ‘লেখকের সামাজিক দায়িত্ব হলো লেখা, সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি করা নয়।’ তবে সেই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করতে ভোলেননি যে, সচেতন কবির মধ্যে রাজনৈতিক মতামত থাকাটাই বরং স্বাভাবিক ঘটনা।

নিজের বিষয়ে বলতে গিয়ে কবি আল মাহমুদ তাঁর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘আমি নিজেকে অহংকারী মনে করি না। অহংকার প্রদর্শন যদি কিছু হয়ে থাকে তো সাহিত্যে হয়েছে। আর সাহিত্য সব সময় অহংকার। যিনি রচনা করেন তিনি মনে করেন এটা তার অহংকার। এতে কোনো দোষ নেই। আর এটুকু আত্মবিশ্বাস না থাকলে সাহিত্য করা যায় না।’ বলা ভালো, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কবিকে এগিয়ে যেতে হয়; তাঁকে একধরনের বিরামহীন যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়, যেখানে শৈল্পিকভাবে বিজয় অর্জন করা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর কথা একজন কবি ভাবতেও পারেন না। সংগত কারণেই এই অহংকার একজন কবিকেই মানায়। বলা যায়, আল মাহমুদের এই আত্মবিশ্বাস তাঁর আত্মশক্তিরই এক ভিন্ন প্রকাশ হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি। আবার এও তো ঠিক যে, কবি তাঁর বর্তমানকে মান্যতা দিয়েও, কবিতার ভবিষ্যতের জন্য অন্যতর—একটা ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা করে থাকেন। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বড় মাপের একজন কবির পক্ষে তাঁর সমকালীন জীবনকে, সমকালের প্রেক্ষাপটকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়। যে কারণে একজন কবির কবিতায় অর্থনীতি-রাজনীতি-সমাজনীতির প্রকাশটা তাঁর আধুনিক জীবনবোধের সূত্র ধরেই বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন; নতুবা কবি-মানসের আধুনিকতার সামগ্রিকতাকে উপলব্ধি করাটা পাঠক ও সমালোচক—উভয়ের জন্যই দুরূহ হয়ে পড়ে।


পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেই আল মাহমুদ এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি আধুনিকতা বলতে একটি জাতির বিশ্ববীক্ষা ও মানসিক অবস্থাকে বুঝি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সহবর্তী হয়ে আমাদের বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লড়াইটাও আধুনিক মানস গঠনে আমাদের জনগণকে সহায়তা করে। সামষ্টিকতার এই সূত্র মেনে কবি আল মাহমুদ কিন্তু তাঁর ব্যক্তিক-স্বাধীনতার সীমানাকে মোটেও খর্ব হতে দিতে চাননি। যে কারণে উপর্যুক্ত বক্তব্যের যথার্থতা স্বীকার করে নিয়েও তার সঙ্গে এই প্রত্যয়টিও মেনে নিয়ে বলেন, ‘সাহিত্যে আধুনিকতা হলো ব্যক্তির অস্তিত্বের স্বাধীনতাকে উপলব্ধি ও কার্যকর করা।’ এইসবের সঙ্গে মানুষে-মানুষে দ্বন্দ্ব-মিলনের উৎসগুলোকে চিহ্নিত করা এবং তার কাব্যিক ব্যাখ্যাকেও স্বীকার করে নিতে চেয়েছেন এই কবি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও