যাদুকাটা থেকে পাটলাই: নদী লুটের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কি জাগবে?
যাদুকাটা নদী নিয়ে গত কয়েক বছরে অসংখ্য সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শুধু যাদুকাটা নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা পাটলাই, ধোপাজান, মাহারাম, শান্তিপুর কিংবা চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীর পাড় কাটা এবং পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা। স্থানীয় জনসাধারণ মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বহুবার সতর্ক করেছে। অবশ্য প্রশাসনও মাঝেমধ্যে এসব নদীতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।
বাস্তবতা হলো, এতে হয়রানির শিকার হয়েছে নিরীহ শ্রমজীবী মানুষজন। কিন্তু নদীগুলোতে বালু-পাথর লুটের সংঘবদ্ধ তৎপরতা থামেনি; আরও সংগঠিত ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে বালুখেকোর দল। প্রশ্ন হলো আইন আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে, জনগণের চাপও আছে; তারপরও কেন নদীগুলোকে রক্ষা করা যাচ্ছে না? কেন থামানো যাচ্ছে না বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য?
যাদুকাটা একসময় ছিল স্বচ্ছ, শীতল ও জীবন্ত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা এই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু কয়েক দশকের নিয়ন্ত্রণহীন বালু-পাথর উত্তোলন, ড্রেজিং এবং নদীর পাড় কেটে বালু সংগ্রহের ফলে নদীটি আজ ভয়াবহ অস্তিত্বসংকটে। একসময় যে নদীর প্রস্থ ছিল গড়ে ৫৭ মিটার, তা এখন কোথাও কোথাও বেড়ে গিয়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এই বিস্তৃতি প্রাকৃতিক নয়; এটি নদীর পাড় খুবলে খাওয়া বালুখেকো মানুষের তৈরি।
রাতের অন্ধকারে ড্রেজার, বোমা মেশিন ও সেইভ মেশিনের সাহায্যে নদীর বুক এবং পাড় কেটে প্রতিদিন হাজারও নৌকায় বালু তোলা হচ্ছে। এর ফলে নদীর দুই পাশের তীরবর্তী ঘাগটিয়া, মানিগাঁও, লামাশ্রম, রাজাগাঁও, সোহালা, বারিক্কাটিলা, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি, গড়কাটিসহ অন্ততপক্ষে বিশটি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও গাছপালা। এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে চলেছে বিশ্বখ্যাত শিমুল বাগানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, নির্মাণাধীন সেতু এবং সরকারি অবকাঠামো। বহু পরিবার ইতোমধ্যে ভাঙনের আশঙ্কায় নিজেদের ঘরের টিন, কাঠ ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এটি শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদার সংকটও বটে।
এই সংকটকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাহিরপুরের পাটলাই, মাহারাম ও শান্তিপুর নদীতেও একই চিত্র। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, নদীতীরবর্তী বসতি এবং ভাটি অঞ্চলের বহু হাওরের কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। কিছুদিন আগে একই অঞ্চলের ধোপাজান নদীতেও একইভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হলেও থামেনি নদীর বুকে বালুখেকোদের আগ্রাসন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নদী লুটের এই অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের অভিযোগ প্রায় সর্বত্রই উঠে আসছে। স্থানীয় মানুষের ভাষ্য, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এমন প্রকাশ্য তৎপরতা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি, হামলা কিংবা সামাজিকভাবে হয়রানির আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে অনেকেই নীরব থাকতে বাধ্য হন। যখন কোনো সমাজে আইনের শাসনের বদলে প্রভাবশালীদের প্রভাব কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন পরিবেশ রক্ষা কেবল প্রশাসনিক নয়, রাষ্ট্রীয় সুশাসনেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশাসনের বক্তব্যও অনেক সময় হতাশাজনক। কোথাও আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা দিয়ে অভিযান সীমিত রাখার কথা বলা হয়, কোথাও আবার পুলিশ জানায় যে নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন যৌথ অভিযানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা কতটা ধারাবাহিক ও কার্যকর হচ্ছে, ওই প্রশ্ন থেকেই যায়। বিচ্ছিন্ন অভিযান, কয়েকটি ড্রেজার ধ্বংস কিংবা সামান্য জরিমানা দিয়ে একটি সুসংগঠিত অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- লুটপাট
- যাদুকাটা নদী