পাহাড়ের কান্না, মানুষের দায়
বর্ষা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদও, আবার সতর্কতার ঋতুও। এই বৃষ্টি আমাদের কৃষিকে বাঁচায়, নদীকে প্রাণ দেয়, প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজায়। কিন্তু একই বর্ষা যখন পাহাড়ের বুক চিরে মাটি নামিয়ে আনে, তখন মুহূর্তেই নিভে যায় অসংখ্য মানুষের জীবন। পাহাড় ধস কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ভুল পরিকল্পনা, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার নির্মম পরিণতি। প্রতি বছর বর্ষা এলে আমরা শোকাহত হই, উদ্ধার অভিযান চালাই, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দিই। কিন্তু বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শোক, সেই প্রতিশ্রুতি এবং সেই প্রস্তুতিও যেন মাটিচাপা পড়ে যায়।
গত বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং-৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটে যাওয়া পাহাড়ধসের ঘটনাটি আবারও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। পাহাড়ধসে একটি মহিলা মাদরাসা ও হেফজখানার চারজন শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। আরও চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বসতি পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
শিশুরা কখনো দুর্যোগের জন্য দায়ী নয়। অথচ পৃথিবীর প্রায় সব বড় দুর্যোগেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় তাদেরই। উখিয়ার এই ঘটনা সেই নির্মম বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা—বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ধসপ্রবণ। বর্ষাকালে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিই পাহাড়ের ঢালকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। কিন্তু শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলে বাস্তবতা আড়াল করা হয়। কারণ পাহাড়ধসের বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ।
বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ধস একটি “ধীরগতিতে তৈরি হওয়া দ্রুতগতির দুর্যোগ”। অর্থাৎ এর ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়, কিন্তু বিপর্যয় ঘটে কয়েক মিনিটে। তাই এর প্রতিরোধের সুযোগও থাকে অনেক আগে থেকেই।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বাস্তবতা আরও জটিল। সীমিত জায়গায় প্রায় দশ লাখের বেশি মানুষের বসবাস, অস্থায়ী ঘরবাড়ি, পাহাড় কেটে তৈরি বসতি এবং ব্যাপক বন উজাড়—সব মিলিয়ে উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কয়েক বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে যে বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টি এই ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার বড় ঝুঁকি তৈরি করে। প্রতি বছর কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভূপ্রকৃতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি মাদরাসা বা শিক্ষাকেন্দ্র কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিচালিত হবে? শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল? ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করে সময়মতো স্থানান্তরের ব্যবস্থা কি করা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে। কারণ প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে যদি প্রতিরোধযোগ্য কোনো অবহেলা থাকে, তবে সেটি শুধু দুর্ঘটনা নয়; তা নীতিগত ব্যর্থতাও।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পাহাড় ধ্বস ও প্রাণহাণি