কেমন হওয়া উচিত নতুন মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
দেশের শিক্ষার মান-এ বলতে গেলে ধস নেমেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মান-এ অবনতির বিষয়টি প্রায় সবাই স্বীকার করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একজন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র বা ছাত্রীর শিক্ষার মান তৃতীয় শ্রেণির মতো। তারা মোটামুটি শুদ্ধভাবে বাংলা কিংবা ইংরেজি ভাষায় লিখতে কিংবা পড়তে হোঁচট খায়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মরহুম ড. নজরুল ইসলাম একবার এক ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, বাংলাদেশের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শুদ্ধভাবে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের নামটি পর্যন্ত লিখতে পারে না। এই যখন শিক্ষার মান, তখন শিক্ষার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা থেকে কতটুকু কাঙ্ক্ষিত বেনিফিট পাওয়া যায়, তা সহজেই অনুমেয়। সর্বোপরি দেশের ভবিষ্যতের দায়িত্ব অর্পিত হবে তাদের ওপর, যারা এখন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এদের পড়াশোনার মান সন্তোষজনক নয় বলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। পাকিস্তান আমলে যারা লেখাপড়া করত, তাদের শিখনের মান বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল। সে কারণে কর্মক্ষেত্রেও তারা দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে সেই প্রজন্মের লোকেরা অবসরে চলে গেছে অথবা মৃত্যুবরণ করেছে। বাংলাদেশোত্তরকালে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে, তাদের অনেকের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমান বিশ্ব প্রচণ্ড রকমের প্রতিযোগিতামূলক। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে দেশ হিসাবে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মান উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রকৃষ্ট পন্থা নিরূপণ এখন সময়ের দাবি।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নির্বাচনি মেনুফেস্টুতে বিএনপি ঘোষণা করেছে যে, দলটি ক্রমান্বয়ে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করবে। এতকাল ধরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ২ শতাংশের কম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পাশ করা হয়েছে, তাতে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এই অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশ। নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। শিক্ষার মান উন্নয়নে সন্তোষজনক বাজেট বরাদ্দ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট নয়। শর্তের যথার্থতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগী সংস্কার। এই শর্ত কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে।
পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কিছু বাছাই করা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে একটি ক্যাডেট কলেজ স্থাপন। এ ক্যাডেট কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক কর্নেল ব্রাউন। এই বিদেশি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তার নেতৃত্বে এই ক্যাডেট কলেজে নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠোরতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক ও শারীরিক শিক্ষার সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটানো হয়। আবাসিক এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ বড় জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। এ কলেজে যত্নসহকারে বাছাই করা শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এসব নিয়োগে দুর্নীতি কিংবা স্বজনপ্রীতির কোনো ঠাঁই ছিল না। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছে অথবা সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ মহিমায় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। নাগরিক হিসাবে এরা দেশের অগ্রণী নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে সারা দেশে ১২টি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের। ক্যাডেট কলেজ আবাসিক। সেখানে সপ্তম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। পড়াশোনা হয় এইচএসসি পর্যন্ত।
পাকিস্তান আমলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য পাইলট স্কুল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। দেশের নির্বাচিত হাইস্কুলগুলোকেই পাইলট স্কুল প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ স্কুলগুলো আগে থেকেই ভালো স্কুল ছিল। এসব স্কুলে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছিল এবং বিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল করার জন্য ল্যাবরেটরিও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের স্কুলগুলোকে পাইলট স্কিমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কালের প্রবাহে পাইলট মাধ্যমিক স্কুলগুলোও অন্য দশটি সাধারণ স্কুলের মতো হয়ে পড়েছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রাইমারি স্কুলগুলোকে মডেল প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করা হয়। নির্বাচিত প্রাইমারি স্কুলগুলোকে মডেল প্রাইমারি স্কুলে যখন উন্নীত করা হয়, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মরহুম আতাউর রহমান খান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ডিপিআই মরহুম খান বাহাদুর আব্দুল হাকিমের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করেন। আজও দেশের অনেক প্রাইমারি স্কুলের নামের আগে ‘মডেল’ কথাটি যুক্ত হতে দেখা যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মডেল স্কুল
- ব্যবস্থাপনা
- কলেজ