যে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন
কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্স ভর্তি পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্র কয়েক দিন ধরে ফেইসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশ্নটা আদৌ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিনা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করিনি। তবে সেখানে ১০টি বিষয়ের মধ্য থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো একটি বিষয়ে যে নিবন্ধ রচনা করতে বলা হয়েছে—এমন সৃজনশীল প্রশ্ন যদি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবহার করা হতো, তবে কত ভালোই না হতো।
ওই প্রশ্নপত্রের বিষয়গুলো পড়লেই বোঝা যায়, এগুলো কেবল মুখস্থ বিদ্যার পরীক্ষা নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, পাঠাভ্যাস, শিল্পবোধ ও জীবনদর্শনেরও পরীক্ষা। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
ক. সাহিত্যে পড়া বা সিনেমায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র
খ. তোমার ছোটবেলার ইচ্ছেগুলো, খামখেয়ালগুলো
গ. ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গার সঙ্গে তোমার এক কাল্পনিক ট্রেন সফর
ঘ. উত্তম কুমার ‘বনাম’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
ঙ. প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশে লেখা তোমার খোলা চিঠি
চ.কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সুখের কথা, ভয়ের কথা,
ছ. যে বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও,
জ.সাহিত্যিকের আড্ডা: বৈকুণ্ঠ মল্লিক, লালমোহন গাঙ্গুলি ও সত্যজিৎ রায়,
ঝ. যে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন,
ঞ.ঈশ্বরকে যদি গুটিকয়েক প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে…
কী অসাধারণ সৃজনশীল এক প্রশ্নপত্র! এগুলোর কোনো একটি বিষয়েরও উত্তর দেওয়ার জন্য কোনো কিছু মুখস্থ করে আসার প্রয়োজন নেই; বরং দরকার হবে দীর্ঘদিন ধরে জীবন উদযাপনের অভিজ্ঞতা। প্রতিটি বিষয় পড়তে পড়তেই যেন ভাবনার সমুদ্রে ডুব দিতে ইচ্ছে করবে।
দুয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করা যাক। শুরুতে প্রথম প্রশ্নটিই ধরা যাক না। সাহিত্যে পড়া সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র কোনটি? খুবই দ্বিধায়ে ফেলে দেওয়া প্রশ্ন নয় এটি? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৈমন্তী, নাকি শরৎচন্দ্রের বিলাসী? নাকি আবারও রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার লাবণ্যের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে? লাবণ্যের কথা যার মনে আসবে, তার কি সমরেশ মজুমদারের মাধবীলতার কথা মনে পড়বে না? আর যিনি হুমায়ূন আহমেদের পাঠক, তিনি হয়তো রূপা ও ‘কৃষ্ণপক্ষ’-এর অরুর মধ্যে কাকে বেছে নেবেন তা নিয়ে বেশ দোলাচলে পড়বেন।
গৎবাঁধা ’একটি নৌকা ভ্রমণ’ বা ’সময়ের মূল্য’ লিখতে লিখতে ক্লান্ত প্রজন্মের কাছে ওপরে উল্লিখিত দ্বিতীয় বিষয়টির কথাই ধরা যাক না। ছোটবেলায় যা যা হতে চেয়েছিলাম এবং সে হতে না পারার আক্ষেপের স্মৃতিচারণ। কেউ কি এখন আর ভুল করেও জিজ্ঞেস করে যে, তুমি ছোটবেলায় কি হতে চেয়েছিলে? তারচেয়ে বরং এই প্রশ্নপত্র যখন কেউ চোখের সামনে মেলে ধরবে, তার সামনে কি গোটা ছোটবেলাটা হুড়মুড় করে এসে দাঁড়াবে না?
স্কুলের পাশ দিয়ে ভটভট শব্দ করে চলে যাওয়া মোটরবাইক যে পোড়া পেট্রোলের গন্ধ ফেলে যেত, তার ঘ্রাণ ছোটবেলায় এত ভালো লাগত যে ওটা শুনতে দৌড়ে রাস্তায় চলে যেতাম! ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বড় মালবাহী ট্রাক চালককে সুপারহিরো মনে হতো। ফলে ১০ বছর বয়সে ট্রাক ড্রাইভার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে বন্ধু সাঈদের সঙ্গে ঘর পালিয়ে যে মহাসড়কের রাস্তায় এসে উঠেছিলাম, জীবনের কাছে সেই গল্প কি নিতান্তই তুচ্ছ?
আবার ধরা যাক উত্তম কুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অংশটির কথা। এই দুজনকে নিয়ে লিখতে হলে তাদের অভিনীত কত সব কালজয়ী সিনেমা দেখতে হবে! উত্তম কুমারের কথা লিখতে গিয়ে কেউ হয়তো ‘সপ্তপদী’ বা ‘হারানো সুর’-এর কথা বলবেন, কেউ ‘মৌচাক’-এর সেই চাকরিপ্রার্থী ছোট ভাইয়ের কথা লিখবে, যে চাকুরি করতে গিয়ে একসময় কন্যাদায়গ্রস্ত বাবাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। আবার কেউ হয়তো ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়কে মনে করবেন, যিনি এক সহযাত্রী সাংবাদিকের কাছে খ্যাতির বিড়ম্বনা কতখানি হতে পারে তার গল্প বলতে থাকেন, অথচ খ্যাতি লাভই যে জীবনের সবকিছু নয়, এর বাইরেও যে আছে বহুকিছু, সেটি আর কয়জন মনে রাখে?
কিন্তু তাতে কি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কম প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন? ‘অপুর সংসার’-এর ঘাড় কাৎ করে রাখা অভিমানী অপু, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর তীক্ষ্ণদৃষ্টির সেই তান্ত্রিক কম কিসে? ‘হীরক রাজার দেশে’তে উদয়ন পণ্ডিত যখন তার ছাত্রছাত্রীদেরকে সঙ্গে নিয়ে দড়ি ধরে রাজার ভাস্কর্যে টান মারে, সেই থেকে অত্যাচারী রাজার পতনের প্রতীক হিসেবে সৌমিত্র প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেননি? আজও রাষ্ট্র বা সমাজ যখন গভীর অন্যায়ে নিমজ্জিত হয়ে ওঠে, তখন সৌমিত্রের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’ নিপীড়িতের ক্ষতে প্রলেপ যোগায়।
ফলে এই প্রশ্নপত্র শুধু একটি ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই নয়; বরং সাহিত্য পড়তে ইচ্ছুক যে কারও সাহিত্যপাঠ বা সিনেমাপ্রেমের মানসিক প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। যে শিক্ষার্থী সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তার ভাবুক মনের কাছে এসব সব জিজ্ঞাসা মোটেও অমূলক নয়। ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাশবন পেরিয়ে ট্রেন দেখতে ছুটে যাওয়ার ব্যাকুলতা যার মধ্যে কখনো জাগেনি, সে সাহিত্যের গভীর রস কতখানি আস্বাদন করতে পারবে?
তবে আমার ভেতর ‘যে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন’ গভীর দ্যেতনা সৃষ্টি করেছে। ফলে এই লেখার শিরোনামও এটি।
এই একটি বিষয়ই যেন হাজারো ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। নগরায়নের ফলে ক্রমশ বৃক্ষহীন হয়ে পড়া শহরে ঘরহারা পাখিদের আর্তি, মাথা ন্যাড়া তালগাছের ডালে বাসা হারানো নিঃসঙ্গ বাবুই নিজেদের মধ্যে ঠিক কী কথা বলে? তাদের ভেতরে কি রাগ-ক্ষোভ দানা বাঁধে? তারা কি মানুষের এহেন নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে অভিযোগের শোরগোল তোলে না?
কনসার্টের মাঠে এক সময় ঘন জঙ্গল ছিল কিন্তু ’এখন কেনো নাই’ বলে চিৎকার করে ওঠা রকস্টার সিনেমার জর্দানের কথাও মনে পড়ে। অনিক দত্তের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ সিনেমার গৃহহারা ভূতদের বিদ্রোহের কথা এসে যায়। নগরায়নের নামে যদি ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে শহরের সব পুরনো বাড়ি ভেঙেই ফেলা হয়, তবে ভূতেরা যাবে কোথায়? সিনেমায় তাই ভূতেরা বিদ্রোহ করে, তারা মানুষের জীবনেই আবার উপদ্রব হয়ে ফিরে আসে। ভাবনার সীমারেখা কতখানি মায়া ও সৃষ্টিশীলতা জড়িয়ে থাকলে এভাবে কেউ ভাবতে পারে?
জঙ্গলহারা পাখিদের অনিশ্চয়তার সঙ্গে কি আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো মিল নেই? মানসম্মত শিক্ষা,নৈতিক বোধ ছাড়া লাখ লাখ শিশু বেড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশই নেয়নি। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি চিত্র। একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই ঝরে পড়ে, তবে প্রশ্ন জাগে, এর পেছনের কারণ কি?
কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে, অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীর অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে। কোথাও বলা হচ্ছে, শিক্ষার মান এতটাই দুর্বল যে অনেকেই ফেল করার আশঙ্কায় পরীক্ষায় বসেনি। কারণ যাই হোক, বাস্তবতা হলো, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে যায়নি এবং এটি দেশের ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর প্রতিফলন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ভর্তি পরীক্ষা
- প্রশ্নপত্র