খেলাপি ঋণে ‘এক্সিট’–সুবিধা, ব্যাংকের প্রায়শ্চিত্ত ও কিছু প্রশ্ন
খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে বিশেষ ‘এক্সিট’ বা নিষ্ক্রমণ–সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, খেলাপি গ্রাহকেরা তাঁদের ঋণের পুরো টাকা এককালীন পরিশোধ করে আরোপিত ও অনারোপিত উভয় ধরনের সুদ মওকুফের সুবিধা নিয়ে দায়মুক্ত হতে পারবেন।
তবে বিষয়টা একেবারেই অভিনব নয়, এককালীন পরিশোধ করে আংশিক বা পুরো অনারোপিত সুদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার এমন ব্যবস্থা বিভিন্ন ব্যাংকে সীমিত মাত্রায় চালু ছিল। এ বিষয়ে ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মধ্যে একাধিকবার বিভিন্ন নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালা জারি হওয়ার ফলে খেলাপি ঋণের গ্রাহকেরা একটা প্রায় ঢালাও সুবিধা পাবেন, যা আগের সুবিধাগুলোর প্রায় অনুরূপ। আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করার পর এই সুদ মওকুফের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলোর জন্য একধরনের প্রায়শ্চিত্ত বললে ভুল হবে না।
কোনো সন্দেহ নেই—ব্যাংকের আটকে থাকা তহবিল উদ্ধার করে তারল্য বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থঋণ মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রায়োগিক জটিলতা ও কিছু নীতিগত প্রশ্নের ফয়সালার মাধ্যমে সদ্য প্রণীত নীতিমালার কিছু বিষয় আরও স্পষ্ট করা উচিত।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, ঋণের ‘আসল’ বা ‘মূল প্রিন্সিপাল’-এর সংজ্ঞা নিয়ে। ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে প্রতি ত্রৈমাসিকে ঋণ হিসাবের ওপর সুদ আরোপ করে ঋণ হিসাব বিকলন করার পর সুদাসল মিলিয়ে নতুন আসল বা ‘প্রিন্সিপাল’ তৈরি হয়। এভাবে কয়েক বছর ধরে ঋণসুবিধা ভোগকারী গ্রাহকের হিসাবে প্রতি প্রান্তিকে তথা ত্রৈমাসিকে ঋণের ওপর সুদ যুক্ত হয়েছে এবং সেই সুদ আসলের সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন ‘আসল’-এ পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক সেই সুদকে নিজেদের আয় খাতে স্থানান্তর করেছে এবং সেটি মূল ঋণের (প্রিন্সিপাল) ভেতরে ঢুকে গেছে। এখন ‘এক্সিট’–সুবিধার আওতায় এককালীন পরিশোধের সময় গ্রাহক কি শুধু প্রাথমিক আসল টাকা ফেরত দেবেন, নাকি বিগত বছরগুলোতে আসলের সঙ্গে সুদ যুক্ত হয়ে যে নতুন আসল হয়েছে, সেটি ধরা হবে? যে সুদের টাকা ব্যাংক ইতিমধ্যে আয় খাতে দেখিয়েছে, তার ওপর সরকারকে আয়কর প্রদান করেছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে, সুতরাং সুদের এই অংশ ব্যাংকের পক্ষে কোনোভাবেই মওকুফ করা বা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।
তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে এ বিষয়টির সুস্পষ্ট ফয়সালা হওয়া জরুরি, তা না হলে খেলাপি ঋণ গ্রহীতারা এই অস্পষ্ট বিষয় নিয়ে বাহানা তৈরি করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ পাবেন।
তবে কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হওয়ার পর যে সুদ আরোপিত হয়েছে, যা ব্যাংক এখনো আয় খাতে স্থানান্তর করেনি, যাকে ব্যাংকিং পরিভাষায় ‘সাসপেন্স ইন্টারেস্ট’ বলা হয়, কেবল সেই সুদই মওকুফযোগ্য হতে পারে। আয়ে পরিণত হওয়া সুদের অংশ মওকুফ করার বিধান করলে নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে স্থগিত সুদ মওকুফ করে আসল টাকা এককালীন আদায়ের এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলের আপত্তি থাকলেও এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো ‘অর্থের সময়মূল্য’ বা ‘টাইম ভ্যালু অব মানি’।
একজন খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য মামলা-মোকদ্দমা করলে তা নিষ্পত্তি হতে পাঁচ থেকে সাত বছর লেগে যেতে পারে। দেশের মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এত দীর্ঘ সময় পর সুদে-আসলে টাকা পাওয়ার চেয়ে বর্তমান সময়ে আসল টাকাটা নগদে পেয়ে যাওয়া ব্যাংকের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। এতে ব্যাংকের হাতে নগদ টাকা আসবে, তারল্যসংকট কাটবে এবং আটকে থাকা মূলধন নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।