শিক্ষার যান, শিক্ষার বাহন : মেক’লের সহিত বিচার

যুগান্তর সলিমুল্লাহ খান প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩

‘ভারতবর্ষীয় প্রাচীন জ্ঞানবিজ্ঞানের অধোগতির প্রধান কারণ এই ভিত্তির সংকীর্ণতা, ব্যাপ্তির অভাব, একাংশের সহিত অপরাংশের গুরুতর অসাম্য।’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘প্রসঙ্গকথা,’ (১৮৯৮)


বাংলাদেশে ব্রিটিশ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন বছর পার হওয়ার আগ পর্যন্ত পূর্ব ভারত কোম্পানির সরকার এই দেশের জনশিক্ষা খাতে কোন অর্থের বরাদ্দ দেন নাই-এই সত্য সকলেই জানেন। সকলে ইহাও জানেন যে বিলেতে পার্লামেন্ট ১৮১৩ সালের সনদ আইনে যে বরাদ্দ মঞ্জুর করিয়াছিলেন, তাহার পরিমাণ ছিল সাকুল্যে দশ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড বা এক লক্ষ ভারতীয় রুপি। ১৮১৩ সালের সনদ আইনে বলা হইয়াছিল এই বরাদ্দের উদ্দেশ্য দুই: প্রথম উদ্দেশ্য ‘সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন ও উন্নতিসাধন আর ভারতীয় পণ্ডিতদের কাজে উৎসাহ যোগান’, আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ‘ব্রিটিশ অধিকৃত এলাকার বাসিন্দাদের নিকট বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রবর্তন ও প্রচারণা।’


‘বিজ্ঞানের জ্ঞান’ বলিতে ১৮১৩ সালের সনদ আইনে কি বোঝানো হইয়াছে, সেই প্রশ্নটি লইয়া কোম্পানির ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। ইহাতে কি ভারতবর্ষের পুরানা বা পরম্পরাগত জ্ঞান বোঝানো হইল, নাকি নির্দেশ করা হইল এয়ুরোপের নতুন বিজ্ঞান ইহাই ছিল তর্কের সার। টাকাটা কার পেছনে খরচ করা কর্তব্য, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি নির্ভর করে আগের প্রশ্নের মীমাংসা কি দাঁড়াইয়াছিল তাহার উপর।


বিতর্কের নিষ্পত্তি হইতে হইতে সময় পার হইল ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত। বিজয়ী পক্ষের কর্মকর্তা, কোম্পানি সরকার নিয়োজিত শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি আর বড়লাটের আইন ও শাসন পরিষদের সদস্য টমাস মেক’লে (১৮০০-১৮৫৯) তাঁহার প্রস্তাবে লিখিয়াছিলেন : ‘এই দেশের বাসিন্দাদের বুদ্ধিগত উন্নতির স্বার্থে সরকারের নির্দেশ অনুসারে খরচ করার মতো একটা তহবিল আমাদের হাতে আছে। প্রশ্নটি সহজ : এই তহবিলটা কাজে লাগানোর সর্বোত্তম উপায় কোনটা?’


তাঁহার সিদ্ধান্ত হইল, শিক্ষার লক্ষ্য হইবে ‘এয়ুরোপের নতুন জ্ঞানবিজ্ঞান’ প্রবর্তন আর তাহা প্রচার করিতে হইবে ইংরেজি ভাষার মধ্যস্থতায়। আজিকালি যে ভাষা চলে, তাহার কৃপায় যাহাকে বলে ‘ইংরেজি মাধ্যম’, তাহা প্রবর্তিত হইল সেই সিদ্ধান্তের জোরে। মেক’লে সাহেব মানে এখন যাঁহারা ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যাবিস্তারের পক্ষপাতী, তাঁহাদের অপর নাম।


ইংরেজি ভাষা কেন শ্রেয় সে কথা মেক’লে সাহেব জানাইয়াছিলেন : ‘কি সংস্কৃত কি আরবি কোন ভাষারই জ্ঞান আমার নাই। তবে ইহাদের গুরুত্ব কতটুকু তাহা সঠিক জানিবার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমি করিয়াছি। যে সমস্ত আরবি ও সংস্কৃত বইপুস্তক সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, আমি সেগুলির তর্জমা পড়িয়া লইয়াছি। যেমন এই দেশে তেমন স্বদেশে, পূর্বদেশের নানান ভাষার শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করিয়াছি। খোদ পূর্ব ব্যবসায়ী বিশেষজ্ঞগণ পূর্বদেশীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের মূল্য যতটুকু নির্ধারণ করেন, সেই মূল্য দিয়া গ্রহণ করিতে আমি বিলকুল রাজি। তাঁহাদের মধ্যে আমি কখনও এমন কাহারও দেখা পাই নাই যিনি অস্বীকার করিতে পারেন যে এয়ুরোপের ভালো কোন গ্রন্থাগারের এক তাক বই গুরুত্বে ভারতবর্ষ আর আরবদেশের সমগ্র জাতীয় সাহিত্যের সমান মূল্যবান।’


ইংরেজি ভাষায় বিদ্যাবিস্তারের পক্ষে মেক’লের যুক্তিটি ছিল অকাট্য : ‘ভারতের শাসকশ্রেণী যে ভাষায় কথাবার্তা বলিয়া থাকেন তাহা ইংরেজি। সরকার অধিষ্ঠিত শহরে-বন্দরে বসবাসরত উচ্চশ্রেণীর দেশীয় অধিবাসীরাও এই ভাষায় বাতচিত করেন। পূর্বদেশের সমুদ্রতীরে যত দেশ আছে, তাহাদের সর্বত্রই এই ভাষা ব্যবসায়-বাণিজ্যের ভাষা হইয়া উঠিবে এই সম্ভাবনা জারি আছে। যে দুইটি বড় এয়ুরোপিয়া সমাজ এক্ষণে গড়িয়া উঠিতেছে, একটা আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে, আরেকটা অস্ট্রালেশিয়ায়, যে সমাজ দুইটি বছর বছর অধিক হইতে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে এবং যেগুলি আমাদের ভারতীয় সাম্রাজ্যের সহিত নিবিড়তর বন্ধনে আবদ্ধ, এই ভাষাটা তাহাদেরও ভাষা।’


কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ছাড়িয়া যদি বলি, ভারতে ইংরেজি ভাষার একাধিপত্য সেই যে নিরঙ্কুশ হইল, আজ পর্যন্ত তাহার আর অবসান হয় নাই। মেক’লের বিজয় নিশ্চিত হইয়াছিল শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতের সহিত তুলনায় ইংরেজি ভাষার গরিমায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও