বিনিয়োগ : ভিয়েতনাম মডেল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে কয়েকটি দেশ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প রূপকথার মতো লিখেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান শক্তি ভিয়েতনাম তাদের অন্যতম। ব্যবসাবান্ধব শুল্কনীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমন্বয়ে দেশটি গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের নতুন পাওয়ারহাউসে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশকে তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে ভিয়েতনাম এখন বিশ্বমানের টেক জায়ান্টদেরও প্রথম পছন্দের গন্তব্য। চীনের বিকল্প খুঁজতে থাকা স্যামসাং, অ্যাপল ও ফক্সকনের মতো কম্পানিগুলোর জন্য ভিয়েতনাম লালগালিচা বিছিয়ে দিয়েছে।
একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ট্যাক্স হলিডের মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনার মাধ্যমে দেশটি শত শত কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করেছে। এই বিনিয়োগের জোয়ারে স্থানীয় অবকাঠামো চাঙ্গা হয়েছে, লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং একসময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম উদাহরণে পরিণত হয়েছে।
১৯৮৬ সালের ‘দোই মোই’ বা অর্থনৈতিক সংস্কার নীতির মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি এখন উচ্চ প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং ও চিপশিল্পের অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে ভিয়েতনাম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এফডিআই নিজেদের ঘরে তুলেছে, তা এককথায় বিস্ময়কর। এই সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত দূরদর্শিতার ফসল।
অন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা এবং সস্তা শ্রমের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন এবং বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী অনগ্রসরতা দুই দেশের নীতিমালার পার্থক্যকেই স্পষ্ট করে।
ভিয়েতনামের কৌশল : ভিয়েতনামের এই অভাবনীয় বিনিয়োগ সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও চতুর ভূ-রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘চীন প্লাস ওয়ান’ মডেল নামে পরিচিত। কোনো কম্পানি তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য শুধু চীনের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প হিসেবে অন্য অন্তত একটি দেশে কারখানা স্থাপন বা বিনিয়োগ করাকে চীন প্লাস ওয়ান মডেল বলে। গত এক দশকে বিশ্বের বড় বড় বহুজাতিক জায়ান্ট চীনের ওপর তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমাতে বিকল্প গন্তব্য হয়ে ওঠে ভিয়েতনাম।
চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা ও সীমান্ত বিতর্ক থাকলেও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত হতে দেয়নি। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে, আবার একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের সঙ্গেও নিজেদের বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়েছে। চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল, কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ খুব সহজেই সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে ভিয়েতনামে চলে আসে। বাংলাদেশ এই সুবিধা নেওয়ার মতো বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ সামনে পেয়েও শুধু কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং সময়োপযোগী অবকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈদেশিক বাণিজ্য
- বৈশ্বিক অর্থনীতি