তারা কেন ‘জামিন’ পান না

বিডি নিউজ ২৪ ড. নাদিম মাহমুদ প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৭

কয়েক সপ্তাহ আগে এক খবরে দেখেছিলাম, জামিনে থাকা অবস্থায় নব্বইয়ের দশকের ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ টিটনকে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।


শুধু টিটন নয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার বেশ কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর শীর্ষস্থানীয়দের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েক হাজার মামলা বাতিল করা হয়েছে, যাকে ওই সময়ের সরকার দাবি করেছে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক গায়েবি’ মামলা। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত মামলাগুলোকে প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, অপরদিকে ‘একই স্ক্রিপ্টে’ রাজনৈতিক হয়রানিমূলক গায়েবি মামলার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।


এইসব রাজনৈতিক মামলার বাইরেও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিচারপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে মামলায় জড়ানোর কারণে মাসের পর মাস ‘বিচারহীনভাবে’ কারাগারে কাটাতে হচ্ছে; যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না হলেও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন করার পরও তাদের ‘জামিন’ দেওয়া হচ্ছে না। জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন হত্যার ‘অবিশ্বাস্য’ মামলায় তাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে। যদিও মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই সংবাদমাধ্যমে স্বীকার করেছেন, এইসব মামলায় তাদের জড়িয়ে ‘হত্যা’ মামলাগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, হত্যা মামলা না দিলে তাদের আটকে রাখা কঠিন হয়ে যেত।


চব্বিশের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দুই সপ্তাহ পর, ওই বছরই ২১ অগাস্ট বিমানবন্দরে আটক করা হয় সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে। তাদের কাঁধে বেশ কয়েকটি ‘হত্যা’ মামলা ঝুলছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সাংবাদিক শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল বাবুকেও গ্রেপ্তার করা হয়।


হত্যা মামলা দেখিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরকে দেড় বছরেরও অধিক সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে। বয়স ও বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া এই প্রবীণ বুদ্ধিজীবীকে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের হত্যা ও নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এক সময়কার তুখোড় সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, যার নেতৃত্বে দেশে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত হয়েছিল, আজ তার কাঁধেই চাপানো হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়!


প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের চেয়েও বেশি অপরাধী? এই তো কিছুদিন আগেই জুলাই হত্যা মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে জামিন দেওয়া হলো। নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কয়েক দফা জামিন দিয়ে ভোগান্তির পর তারও মুক্তি মিলেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কিছু কিছু নেতা-কর্মী তো জামিন পাচ্ছেন; তারা যদি জামিন পান, তাহলে শাকিল-রূপা কিংবা শাহরিয়ার কবিরদের ‘জামিন’ কেন দেওয়া হচ্ছে না?


এই কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে অনেক সাংবাদিক অপেশাদারসুলভ আচরণ করেছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সগুলোতে ‘তৈলমর্দনমূলক’ সাংবাদিকতা পুরো জাতিকে হতাশ করেছে। সাংবাদিকতার চেয়ে সেখানে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি আগে এসেছে। অনেকেই ব্যবসায়িক সুবিধা নিতে সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা বর্তমান সময়েও ঘটছে।


আপনি যদি শাকিল কিংবা ফারজানা রূপার সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে সেটি অবশ্যই জনসম্মুখে আসুক। তারা কোন কোন প্রতিবেদনে অপেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন তা নিয়ে আলোচনা হোক, প্রয়োজনে তাদের কালো তালিকায় রাখা হোক। কিন্তু তা না করে, কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রোশ থেকে বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পরিপন্থী। তারা যদি আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হয়ে ‘অবৈধ’ ধনসম্পদ অর্জন করেই থাকেন, তবে ওই বিষয়ে মামলা হোক, তদন্ত হোক, বিচার হোক। কিন্তু তারা হত্যা করেছেন—এমন মিথ্যাচারের কাঠগড়ায় বিচারহীনতার খপ্পরে মাসের পর মাস জেলে থাকবেন, তা নিয়ে জনমনে স্বাধীন ‘বিচার ব্যবস্থা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। একই ধরনের প্রশ্ন উঠবে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রেও।


‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলার কথা বলে বছরের পর বছর অপরাধীদের অপরাধ প্রশমনের দৃষ্টান্ত নতুন নয়। আবার সত্যি সত্যি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলারও দীর্ঘ ইতিহাস এ দেশে রয়েছে। শেখ হাসিনা আমলে অনেক হাস্যকর ‘রাজনৈতিক মামলা’ হয়েছে। ময়লার ট্রাক ভাঙচুর থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা পর্যন্ত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, এইসব মামলা দেখলেই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এগুলো স্রেফ হয়রানি কিংবা প্রতিশোধমূলক মামলা।


পত্রিকায় দেখেছি, সাংবাদিক দম্পতি শাকিল-রূপাকে জামিন দেওয়ার পরও ফের অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। কার নির্দেশে এমন কাজ হচ্ছে তা আমরা জানি না, তবে খালি চোখে আমরা এই কাজটি জবরদস্তিমূলক হিসেবেই দেখি।


আমরা দেখছি, চব্বিশের অপার সম্ভাবনাময় সময়ে ‘বিচার ব্যবস্থাকে’ ফের ক্ষমতাসীনদের করদরাজ্যে পরিণত করার অভিযোগ কেউ খণ্ডন করতে পারছে না। ফলে তাজা প্রাণ হারানো মানুষগুলোর ন্যায্য বিচার প্রাপ্তি নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। আর এই সংশয়ে ঘি ঢেলে দেওয়া হয় তখন, যখন সাংবাদিক, শিক্ষক ও সমাজকর্মীদের ‘হত্যা মামলায়’ ঢুকিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে জেলে বন্দি রাখা হয় এবং জামিন দেওয়া হয় না। এর ফলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত লাগে।


চার সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময়ও দাবি জানিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) বেশ কয়েকবার বিবৃতি দিয়ে তাদের মুক্তি ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলেছে।


সবচেয়ে দুঃখজনক খবর হলো, ওই সাংবাদিকের মুক্তির বিষয়ে এ দেশের সাংবাদিক সমাজই আজ সোচ্চার নয়। যেমন সোচ্চার তারা ছিল না আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের পর। এমনকি এই চার সাংবাদিকের কেউই পারতপক্ষে অন্য সাংবাদিকদের অধিকার ও গ্রেপ্তার বিষয়ে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন কি না, তা আমার জানা নেই। ফলে আজ তাদের গ্রেপ্তারের পর সাংবাদিক সমাজের এই নীরবতার ফসল ঘরে তুলছে ক্ষমতাসীন দলগুলো।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও