বহুমুখী কূটনীতির নতুন ছক: প্রধানমন্ত্রীর তিন সফরের তাৎপর্য
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস হতে চলল। নির্বাচনের আগে থেকেই বিএনপি সব ক্ষেত্রেই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণের কথা বলেছিল। সরকার গঠনের এই অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর করলেন, সেখানেও এই নীতির প্রতিফলন ফুটে উঠেছে। এক যাত্রায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফর ও একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন তিনি।
অন্য সরকারপ্রধানদের মতো কোনো চার্টার্ড ফ্লাইটে নয়, বরং নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তিনি দেশ ছেড়েছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকজন নিয়ে সরকারপ্রধানদের বিদেশ সফর করার রেওয়াজ পুরোনো। কিন্তু এখানেও ব্যতিক্রম ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করতে তাঁর সফরসঙ্গীর সংখ্যা ছিল ৩০–এর কম।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরগুলো ছিল অত্যন্ত অর্থবহ। পররাষ্ট্রে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট পলিসি’ এবং বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, এসব সফরে তা বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তরিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। পুত্রজায়া থেকে দালিয়ান, সেখান থেকে বেইজিং; সবখানেই বিনিয়োগ টানার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে।
চীনের দালিয়ানে সামার দাভোস সম্মেলনে জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে বিশেষ বার্তা বহন করে। এই সফরগুলোর প্রতিটি বৈঠক ও সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো পক্ষের সঙ্গে জোটবদ্ধতা, হেজিং কিংবা ব্যালান্সিং নয়, বরং নিজস্ব কৌশলগত স্বকীয়তা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বজায় রেখেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
মালয়েশিয়া সফর
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর ছিল ১৮ ঘণ্টার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফর। ২২ জুন স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথমে একান্ত ও পরে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক হয়। এতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চশিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণ এবং ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের বিষয়টি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় শরণার্থী প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
মালয়েশিয়া এই সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ভিডিওতেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের সম্মতিতে মোট ৯টি বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩৩টি পয়েন্ট সংবলিত একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে পাঁচটি বড় মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান—পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ার এশিয়া, পারোডুয়া ও এমএমসি করপোরেশন—বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও পরিকল্পনার কথা জানায়। এমনকি বিনিয়োগের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করতে দ্রুত বাংলাদেশ সফরের আগ্রহও প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রী তাদের বাংলাদেশ সরকারের ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির বিষয়ে আশ্বস্ত করেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্রীষ্মকালীন দাভোসে
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কোনো বহুপক্ষীয় সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনের প্রথম দিন ২৩ জুন তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ডেল্টা রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গ্রহণে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে সমন্বিত ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিএনপি সরকার
- পররাষ্ট্রনীতি