দক্ষিণ এশিয়ার ‘পানি-শত্রু’
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ‘রক্তের চেয়ে পানি ঘন’ প্রবাদটি এখন আর কেবল রূপক নয়, বরং এক কঠোর ও নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিক নদীগুলোকে একতরফা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারত পানিপ্রবাহকে কবজা করায় প্রতিটি প্রতিবেশী ক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত। সীমান্ত ও অন্যান্য বিষয়ের সংকটের সঙ্গে সঙ্গে পানি সমস্যা তৈরি করায় ভারতের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণপ্রবাহ হুমকির সম্মুখীন।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সিন্ধু নদকে ঘিরে ভারতের যে কোনো একতরফা পদক্ষেপ যদি পাকিস্তানের পানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে ইসলামাবাদ সামরিক পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধা করবে না। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু পানিচুক্তি’ (Indus waters treaty) স্থগিত বা পুনর্বিবেচনা করার বিষয়ে দিল্লির সাম্প্রতিক তোড়জোড়ের প্রতিক্রিয়ায় এ হুঁশিয়ারি এসেছে; কিন্তু এ সংকট কেবল পাকিস্তানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর বুকেও এখন দিল্লির একই আগ্রাসী পানি-রাজনীতির ছায়া সুস্পষ্ট। নেপাল ও চীনের সঙ্গেও পানি নিয়ে ভারতের টানাপোড়েন রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তবে ক্রমান্বয়ে তার প্রতিবেশীদের জন্য এক একক ‘পানি-শত্রু’ বা ‘Water hegemon’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে?
ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রধান নদী ও জলপ্রবাহের উৎস সিন্ধু গঙ্গা/পদ্মার ক্ষেত্রে যে আচরণ করছে, তা শুধু আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন নয়, চরম অমানবিক ও কর্তৃত্বমূলক। ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানিচুক্তিকে বিশ্বের অন্যতম সফল দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হিসাবে গণ্য করা হতো, যা যুদ্ধাবস্থায়ও টিকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারত এ চুক্তির শর্তাবলি সংশোধন বা স্থগিত করার জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। খাজা আসিফ যথার্থই পানি ইস্যুটিকে পাকিস্তানের ‘জাতীয় নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। সিন্ধু অববাহিকার পানির ওপর পাকিস্তানের কৃষি ও অর্থনীতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ভারত যদি উজানে বাঁধ দিয়ে এ পানিপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যাহত করতে চায়, তবে তা পাকিস্তানের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ফলে পানির হিস্যা রক্ষায় পাকিস্তানের সামরিক শক্তির ব্যবহারের হুমকি কোনো ফাঁকা আওয়াজ নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার শেষ মরণকামড়।
পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধকে চিরবৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কের জের বলা যেতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দিল্লির আচরণ কেমন? বিগত দশকগুলোয় তথাকথিত ‘বন্ধুত্বের’ আড়ালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পানি আচরণ কোনোভাবেই সুপ্রতিবেশীসুলভ ছিল না। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে শুরু করেছে। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালেই শেষ হতে চলেছে। বিগত দিনগুলোয় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ কখনোই চুক্তির ন্যায্য হিস্যা পায়নি, অথচ বর্ষাকালে ভারত নিজেদের বন্যা এড়াতে ফারাক্কার সব গেট একসঙ্গে খুলে দিয়ে বাংলাদেশে কৃত্রিম বন্যা তৈরি করে। এ দ্বিমুখী নীতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের জীবনযাত্রার ওপর চরম আঘাত।
তদুপরি তিস্তা নদী এখন উত্তরবঙ্গের কান্নার অপর নাম। ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা বাংলাদেশ অংশে একটি মরা খালে পরিণত হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ‘তিস্তাচুক্তি’ করার মুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু দিল্লি দৃশ্যত কোনো আন্তরিকতা দেখায়নি। উলটো সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সেচ ক্যানেল তৈরি করে তিস্তার বুক চুষে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের সিলেট ও কুমিল্লা অংশের নদীগুলোও ভারতের পদক্ষেপের কারণে ক্রমশ নাব্য হারাচ্ছে। সীমান্তের সব অংশেই ভারত শুধু পুশইন করে লোক ঠেলে দিচ্ছে না, অভিন্ন নদীগুলোকেও মৃত্যুর মুখে ফেলেছে; যার ভয়াবহ পরিণামে মাটি শুষ্ক ও বন্ধ্যা আর প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অথচ আন্তর্জাতিক নদী আইন (যেমন: ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহারসংক্রান্ত কনভেনশন) স্পষ্ট বলে, কোনো রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন নদীর পানি একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ বা উজানের দেশ হিসাবে ভাটির দেশের ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু ভারত হেজিমোনিক (Hegemonic) বা আধিপত্যবাদী আচরণ চরিতার্থ করতে এ আইনগুলোকে পাত্তাই দিচ্ছে না। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ খাতের ওপরও দিল্লির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ একই আধিপত্যবাদেরই অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের এ পানি-কৌশলকে ভূরাজনীতির গবেষকরা ‘Hydropolitics’ বা ‘পানি-রাজনীতি’ হিসাবে আখ্যা দেন। ভারত মূলত পানিকে একটি কৌশলগত অস্ত্র (Weaponization of water) হিসাবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানকে চাপে রাখতে তারা সিন্ধুচুক্তি ভাঙার ভয় দেখাচ্ছে, আর বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে বশংবদ রাখতে গঙ্গা-তিস্তার পানির টোপ ব্যবহার করছে। পাকিস্তান এজন্য ভারতকে হুমকি দিয়েছে। বাংলাদেশও বারবার সমস্যার সমাধানের জন্য বলে আসছে; কিন্তু ভারত কর্ণপাত ও তোয়াক্কা করছে না। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্যে কালক্ষেপণের মাধ্যমে সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করছে ভারত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পানি চুক্তি