বাজেট বাস্তবায়ন : কিছু পরামর্শ
গত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতিতে লুটপাট হয়েছে। কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন সাড়ে ৩ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে, বলতে গেলে আর্থিক খাতের ভিত পুরোপুরি ধসে পড়েছে। দেশে এখন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি বিরাজমান। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এ বাজেট আমার কাছে আশাব্যঞ্জকই মনে হয়েছে। বাজেট প্রায় সব খাতকেই স্পর্শ করেছে। তবে এবারের বাজেটে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। সেটা হচ্ছে, সমাজকল্যাণ বা সোশ্যাল সেফটি নেটের জন্য বিরাট অঙ্কের টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলোর অধীনে রয়েছে কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ইত্যাদি। এর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, জুলাই শহীদদের জন্য ভাতাও রয়েছে।
জেটের আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, সেটা হচ্ছে, ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এটা অর্জন করতে পারলে ভালো। তবে এটা অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতকে প্রাইভেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাত বলতে গেলে এখন ঘুমিয়ে আছে। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতের এখন ক্রেডিট ডিমান্ড নেই বললেই চলে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ খুব একটা হচ্ছে না। শুধু সরকারি ব্যয় দিয়ে তো ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে না। তারপরও আমি আশাবাদী, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশের জায়গায় যদি ৫.৫ শতাংশও অর্জন করতে পারে, তাহলে সেটাও হবে বড় ধরনের অর্জন।
আরেকটি বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত; সেটা হলো, রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় মেটাতে। মোট রাজস্ব আয় অর্থাৎ সরকারি আয় থেকে ৭২ শতাংশ চলে যায় সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় বাবদ। এত বিশাল পরিমাণ টাকা যদি সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়েই চলে যায়, তাহলে উন্নয়ন বাজেটের জন্য থাকে খুবই সামান্য। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী একটি ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা হলো, চলতি অর্থবছরে সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়কে ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা। তার এ ঘোষণাকে আমি সাধুবাদ জানাই। এটা করতে পারলে সরকারের উন্নয়ন বাজেটে কিছুটা যোগ হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সেটা দুরূহ হবে। কারণ, সরকারের আকার না কমিয়ে, অর্থাৎ এত বিভাগ, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, এত জাতীয়করণকৃত বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, ইবতেদায়ি-এগুলো না কমিয়ে এটা কীভাবে সম্ভব হবে, আমার বুঝে আসে না। এ পরিচালনাগত ব্যয়কে যদি ৭২ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশেও কমিয়ে আনা যায়, তবুও সেটা হবে বিরাট অর্জন। তার এ উদ্দেশ্যটি সঠিক।
আমরা সব সময় বলে আসছি, সরকারের আকার ছোট করা উচিত। তাতে সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় কমবে এবং উন্নয়ন বাজেটের জন্য বেশি অর্থ পাওয়া যাবে। উন্নয়ন বাজেট এবং ঘাটতি বাজেট প্রায় ফিফটি-ফিফটি অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫৪ শতাংশ আর বহির্বিশ্ব থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থ সংগ্রহের একটি অনুপাত রয়েছে। অর্থাৎ সরকার ঘাটতি বাজেট পূরণের জন্য এ অনুপাতে দেশের আয়ের উৎস থেকে এবং দেশের বাইরে থেকে ধার করবে। একটা প্রশ্ন আছে, বৈদেশিক উৎস থেকে চাহিদামাফিক অর্থ পাওয়া যাবে কিনা। কেননা গত বছর জুনের শেষে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থ প্রত্যাশা করেছিল, সে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়নি। সামনে যদি ওই অনুপাতে প্রাক্কলিত অর্থ না পাওয়া যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর আবার একটা বাড়তি চাপ পড়বে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বাজেট