শিক্ষা কি তবে শিশুর হাতের মোয়া
সম্প্রতি একজন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার জন্য গাছে উঠতে হয়েছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য। এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি নিছক একটি ভাইরাল ভিডিও ছিল না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। এখন প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষককে যদি চাকরি বাঁচানোর জন্য গাছে উঠতে হয়, তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার হাল কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে!
দীর্ঘদিন ধরেই পাঠদান নিয়ে একটা গুরুতর অভিযোগ হলো, ‘স্কুল-কলেজে এখন আর পড়াশোনা হয় না।’ কিন্তু এই অভিযোগের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গলদই ধরা পড়ে।
আশির দশকে যখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, তখন শিক্ষকদের প্রতি এই অপবাদ ছিল না। আমাদের শিক্ষকেরা তখন গৃহস্থালি কাজ শেষ করে ধীরেসুস্থেই আসতেন। শুনতে অবাক লাগবে, তাও বলি—বন্যা, খরার মতো দুর্যোগ মুহূর্তে ছাত্ররাও হাত লাগাত শিক্ষকের সেই গৃহস্থালি কাজে। কাজেই কোনো দিন কোনো একজনের দেরি হয়ে গেলে উপস্থিত অন্য শিক্ষকেরা তা সামলে নিতেন। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা, মোবাইল ফোন কিংবা অনলাইন পর্যবেক্ষণ ছিল না, শিক্ষকদের উপস্থিতি নির্ভর করত মূলত তাঁদের পেশাগত বিবেক, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর। ফলে শিক্ষক এসেই দু-চারটা ক্লাস দায়সারাভাবে নিয়ে আবার বাড়ির পানে রওনা হয়ে যেতেন না, আসলে যেতে পারতেন না। কেন পারতেন না? সেই বিবেকবোধে তাড়িত হয়ে শ্রেণিকক্ষে সেদিনই তা পুষিয়ে দিতেন। এমনও হয়েছে, ছুটির সময় পেরিয়ে গেলেও পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আটকে রাখতেন। যতক্ষণ ক্লাসে থাকতেন ততক্ষণ তাঁর সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করতেন শিক্ষাদান গ্রহণের বিষয়টাকে ফলপ্রসূ করতে। এখনো তা-ই হতো যদি না আমাদের আমলাতান্ত্রিক মোটাবুদ্ধি শ্রমিক শ্রেণির মতো শিক্ষকতাকে ৯টা ৫টার চাকরি না বানিয়ে ফেলা হতো।
আমিও একজন শিক্ষক, কাজেই বিবেকবোধ যে ডিজিটাল হাজিরার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, তার প্রমাণ আমি নিজে। পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব পালনে মাঝে মাঝেই ছুটির বা
পূর্ব প্রস্থানের প্রয়োজন হয়, বা পথের বিড়ম্বনায় আগমন-প্রস্থানে একটু এদিক-ওদিক হয়ে যায়। তখন আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের শরণাপন্ন হই, তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করি।
বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানপ্রধান যে সব সময় ইতিবাচক থাকতে পারেন তেমন না, কিন্তু যেদিন পারেন সেদিন মনটা এত প্রফুল্ল আর নির্ভার থাকে যে তার পুরো প্রভাব পড়ে সেদিনের শ্রেণিকক্ষে, ক্লাসটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, যাকে সেরা ক্লাস বলা উচিত। এরই নাম প্রণোদনা!
শিক্ষা প্রশাসনের কাজ শিক্ষকদের প্রণোদিত করা অথচ এখনকার সময়ে হচ্ছে সবকিছু উল্টো। বর্তমানে এমন একজন শিক্ষকও কি পাওয়া যাবে (রাজনৈতিক আনুকূল্য নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম) যিনি ৯টার পরিবর্তে ১০টা-১১টায় গিয়ে হাজির হন?
একজন শিক্ষকের মনঘড়ি-দেহঘড়ি এমনভাবে সেট হয়ে যায় যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টা অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মের মতো হয়ে যায়। যেহেতু বিভিন্ন বাহন ব্যবহার করে শিক্ষকদের স্কুলে পৌঁছাতে হয়, সেহেতু মাঝেমধ্যে ৫-১০ মিনিট বা সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। এই দেরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের যে খুব ক্ষতি হয়ে যায়, তেমনও না। ঠিক ৯টায় সব শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয় না বলে উপস্থিত শিক্ষকেরা তা ম্যানেজ করতে পারলেও হইহই হুলুস্থুল পড়ে যায় শিক্ষা প্রশাসকদের মধ্যে। ইদানীং আবার হাতে হাতে মুঠোফোন থাকায় আগাপাছতলার সবাই বড় বড় সাংবাদিক বা হুজুগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর! ভিউ-বাণিজ্যের আশায় তারা ওত পেতে থাকে সবকিছুতে। শুধু কি ভিউ-বাণিজ্য? কান পাতলে দেখবেন তার চেয়েও বেশি কিছু।
সম্প্রতি ডিজিটাল হাজিরার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। ঠিক ৯টায় সব শিক্ষকের হাজিরার ছবি তুলে সংশ্লিষ্ট জায়গায় পাঠাতে হয়। এক মিনিট দেরি হয়ে গেলে সেই শিক্ষক সেদিন অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য হন। আর এই দেরি হওয়াটা কোনো ভিউ ব্যবসায়ীর কবলে চলে গেলে সেই শিক্ষকের চাকরি বাঁচাতে জুতার তলা ক্ষয় হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা তো নষ্ট হয়ই, যাপিত জীবনটাও হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ!
- ট্যাগ:
- মতামত
- ডিজিটাল
- হাজিরা
- প্রধান শিক্ষক