পলাশীর ট্র্যাজেডি এবং জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার

বাংলার ইতিহাসে ২৩ জুন একটি বেদনাবিধুর দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যকার যুদ্ধে নবাবের পরাজয় কেবল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথই বদলে দেয়নি, বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পলাশীর মর্মন্তুদ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা হারানোর সূচনা হয়। পলাশীর পরাজয়ের ফলে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের যে দীর্ঘ ও অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার অভিঘাত দুই শতাব্দীরও বেশি এ উপমহাদেশের মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বিকাশ এবং সামাজিক অগ্রগতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই ২৩ জুন কেবল একটি পরাজয়ের স্মারক দিন নয়; এটি জাতীয় আত্মসমালোচনা, ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ এবং স্বাধীনতার মূল্য অনুধাবনের এক অনিবার্য দিন। বিভেদ, বিভক্তির বিষময় ফল এবং বিপরীতে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির গুরুত্ব অনুধাবনের দিন।


ইতিহাসের বিচারে পলাশী ছিল এক যুগসন্ধিক্ষণ। পলাশী পূর্ববাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে বাংলা ছিল সমকালীন বিশ্বের বিস্ময়। ইউরোপীয় পর্যটক ও বণিকরা বাংলাকে ‘প্রাচ্যের স্বর্ণভান্ডার’ বা ‘সোনার বাংলা’ হিসাবে অভিহিত করতেন। কিন্তু এ সমৃদ্ধির অন্তরালে নবাবি আমলের শেষদিকে বাংলায় রাজনৈতিক দুর্বলতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভিজাত শ্রেণির স্বার্থান্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির অভাব ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। ইংরেজরা পুরোমাত্রায় এর সুযোগ নেয়। নবাববিরোধী ষড়যন্ত্রকারী এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে আঁতাত করে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় নিশ্চিত করে। বস্তুত, পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পেছনে ইংরেজদের সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি। মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান প্রমুখের ষড়যন্ত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে বিদেশি শক্তির হাতে সমর্পণ করেছিল। পলাশী আমাদের সামনে এক চিরন্তন সত্য উন্মোচন করে-কোনো জাতির পতন বাইরের আক্রমণে যতটা ঘটে, তার চেয়ে বেশি ঘটে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, স্বার্থান্ধতা ও নেতৃত্বের সংকটের কারণে।


পলাশী ছিল ভারতবর্ষের পরাধীনতার দীর্ঘ যন্ত্রণার সূচনাকাহিনি। পলাশীর পরাজয়ের মাধ্যমে বঙ্গ-ভারতে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল, তার ফল ছিল ভয়াবহ। বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। শিল্প ও বাণিজ্যের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে শোষণের নির্মম চক্র। রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতাও জাতির ওপর ভর করে।


পলাশী নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ অধ্যায়। কিন্তু পলাশীকে শুধু শোকগাথা হিসাবে দেখলেই হবে না। পলাশীর ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, ইতিহাসের প্রতিটি ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা বহন করে। পলাশী আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে। আমরা বুঝতে পারি, জাতীয় ঐক্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি একটি জাতিকে কীভাবে বহিরাগত শক্তির পদানত করে পলাশী তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতীয় সংহতিকে রাষ্ট্রশক্তির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। পলাশীর ঘটনাও সেই সত্যকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।


বিশ্বায়নের যুগে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরও নতুন মাত্রা লাভ করেছে। কারণ বর্তমানের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে উপনিবেশবাদের রূপ বদলেছে। এখন আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জাহাজ বোঝাই সৈন্য নিয়ে আসে না। আজকের বিশ্বে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে কামান-বন্দুকেরও প্রয়োজন হয় না। এখন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, ‘সফট পাওয়ার’, ঋণফাঁদ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্যপ্রযুক্তির আধিপত্য, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ, কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রভাববিস্তারের মাধ্যমেও প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে দুর্বল ও পঙ্গু করা যায়। এ বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ বিভক্তি যে কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। যে রাষ্ট্রের জনগণ পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল নয়, যে রাষ্ট্রে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐকমত্য নেই, সেই রাষ্ট্র বহুমাত্রিক সংকটে পড়ে।


প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কথা বলা যায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত, তথ্যবিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস জাতীয় শক্তিকে ক্ষয় করছে। জাতীয় সংহতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। অথচ বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসাবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেই ঐক্যের শক্তিই ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। এদিক থেকে পলাশী ও মুক্তিযুদ্ধ-এ দুটি ঘটনা আমাদের সামনে ইতিহাসের একটি অভিন্ন শিক্ষা তুলে ধরে এবং তা হলো জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও