চামড়াশিল্প হতে পারে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা
এবারের কুরবানির ঈদে পশুর চামড়া নিয়ে যে মহা কেলেঙ্কারি হয়ে গেল তাতে দেশবাসী ক্ষুব্ধ ও চরমভাবে অসন্তুষ্ট। কয়েক বছর ধরে কুরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়া নিয়ে একই ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। ৪-৫ বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। কুরবানির পশু জবাই করার পর পশুর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম নিয়ে পুরোদস্তুর দরকষাকষি করত। কিন্তু গত কয়েক বছরে কোথাও এরকম দৃশ্য দেখা যায়নি।
এবার যা ঘটেছে, তা উদ্বেগজনক। যারা নামমাত্র দামে কুরবানির পশুর চামড়া কিনেছিল মোকামে নিয়ে সেগুলো বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে, তারা কেনা দাম তো পায়ইনি, এমনকি চামড়া পরিবহণের খরচও উঠাতে পারেনি। রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া খালে, ডোবায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে অথবা গর্ত করে পুঁতে ফেলেছে। চামড়ার মতো একটি মূল্যবান সম্পদ এভাবে বিনষ্ট হতে দেখে কান্না চলে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ তার দেশকে বলেছিলেন, ‘দুর্ভাগা দেশ।’ কেন তিনি নিজ মাতৃভূমি সম্পর্কে এমন ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেছিলেন, তা আজ পশুর চামড়া মূল্যহীন হয়ে পড়তে দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না।
গত কয়েক বছরে খামার পদ্ধতিতে গবাদি পশু লালনপালন ও মোটাতাজাকরণ ব্যাপকভাবে হচ্ছে। একসময় কুরবানির ঈদে দেশীয় পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় আমাদের ভারতীয় পশুর ওপর নির্ভর করতে হতো। সীমান্তপথে যখন চোরাচালানের পশু দেশের ভেতরে প্রবেশ করত, তখন আমাদের সীমান্তরক্ষীরা এসব দেখেও না দেখার ভান করত। কারণ দেশে পশুর ঘাটতি ছিল। আন্দাজ করা যায়, বিগত কয়েক বছরে কুরবানির পশুর চাহিদা বেড়েছে। পশুর বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের ঔৎসুক্যেরও ঘাটতি নেই। পশুর হাট ইজারা নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ভালো ব্যবসা করে। তদুপরি হাটকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডে সাময়িকভাবে অনেকের কর্মসংস্থান হয়। সব মিলিয়ে বলা যায় পশুর হাটকে কেন্দ্র করে কুরবানির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।
অধিক সংখ্যক পশু কুরবানি হওয়ার ফলে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণের চাহিদাও বাড়ে। এবার অনেকে অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় লবণের দাম বেড়ে গিয়েছিল। পর্যাপ্ত লবণ থাকলে সংরক্ষণ করে চামড়ার মূল্য ধরে রাখা যায় এবং চামড়া পরবর্তী পর্যায়ে অধিকতর প্রক্রিয়াকরণে কাঁচা চামড়াকে ব্যবহার করা সম্ভব।
দেশব্যাপী কুরবানির পশুর চামড়ার কার্যত কোনো মূল্য না থাকায় শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পশুর খামারিরা। কারণ পশু লালনপালন করে বড় করে তুলতে পারলে চামড়ার পরিধিও বিস্তার লাভ করে এবং প্রতিটি পশুতে মূল্য সংযোজন হয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পশু বিক্রয় করে খামারিরা যে দাম পেত চামড়ার দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যাওয়ায় তেমন দাম পায় না। অর্থনীতির ভাষায় বলা যায় জিডিপির একটি অংশ কাজে না লাগায় হারিয়ে যায়। জাতীয় অর্থনীতির জন্য এ ক্ষতি খুবই উদ্বেগজনক এবং চিন্তার বিষয়। নানাভাবে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ঘটনায় যেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়, তেমনই কুরবানির পশুর চামড়ার দাম না থাকার ফলে এ ক্ষতি আরও গভীর হয়। ’৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে যে সংখ্যক কুরবানি দেওয়া হতো, তার প্রতিটি চামড়া ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। ওই সময় চামড়ার বাজার চাহিদার দিক থেকে এতই তেজি ছিল যে, চামড়া হয়ে উঠেছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য। জানি না আওয়ামী লীগের শাসনক্ষমতার সঙ্গে চামড়ার কি যোগসূত্র যে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে বিশাল এই শিল্পে ধস নামতে শুরু করে।
চামড়া বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় মাল্টি বিলিয়ন ডলার খাত। বাংলাদেশে পোশাক খাতে যে আকর্ষণীয় বিকাশ হয়েছে তার বাইরে অন্য কোনো খাতে শিল্পের তেমন বিকাশ হয়নি। বছরের পর বছর পেশাক মালিকরা যে মুনাফা করেছেন তা যদি তারা পোশাকশিল্পের বাইরে অন্য খাতে, বিশেষ করে চামড়াশিল্প খাতে বিনিয়োগ করতেন; তাহলে চামড়াশিল্প রমরমা হয়ে উঠতে পারত। দুষ্টুলোকরা বলে, পোশাক খাতের মালিকরা বছরের পর বছর প্রণোদনাপুষ্ট হয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে তার একটি অংশ তারা বিদেশেই রেখে দেয়। যদি তারা পোশাক খাত থেকে লব্ধ অর্থ চামড়াসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করত তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী হতো। এতে অর্থনীতির শক্তি সামর্থ্য অনেক গুণ বেড়ে যেত।