প্রস্তাবিত বাজেট কি ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারবে?
গণ-অভ্যুত্থান ও দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনপ্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়।
তবে এবারের বাজেট মৌসুমের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি সম্ভবত সংখ্যার বাইরে। সরকারি বাজেটের আগেই ৫ জুন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ৯ জুন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী পূর্ণাঙ্গ ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছে, আর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগসহ (সিপিডি) নাগরিক সমাজ দিয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে ছায়া বাজেট পরিণত রাজনীতির লক্ষণ। প্রশ্ন হলো, এই তিনটি দলিল আর নাগরিক পরামর্শকে আমরা কেবল রাজনৈতিক তর্কের উপাদান হিসেবে দেখব, নাকি একটি ভালো জাতীয় বাজেট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগাব?
সংখ্যায় তিন বাজেট
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একাই তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি (এর মধ্যে ব্যাংকঋণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি) এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা। লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো।
তুলনায় জামায়াতের ছায়া বাজেটের আকার ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা, ঘাটতি ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি, অর্থাৎ রাজস্ব প্রাক্কলন প্রায় ৬ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এনসিপির ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ছায়া বাজেট ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে মাত্র ৬২ হাজার কোটি টাকা বেশি, আর ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশে সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ দুই বিরোধী প্রস্তাবনাই আকারে ছোট ও ঘাটতিতে রক্ষণশীল। বার্তাটি স্পষ্ট: রাজস্ব সক্ষমতার বাস্তবতা মেনে ব্যয়ের উচ্চাভিলাষ সংযত করা।
রাজস্ব লক্ষ্য ও ঘাটতি: বাজেটের সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ
অর্থমন্ত্রী নিজেই সংসদে স্বীকার করেছেন, কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা; বাস্তবে তারা এই টাকাও তুলতে পারবে না। সেখান থেকে এক লাফে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটিতে যেতে হলে দরকার ১৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি, অথচ এনবিআরের ঐতিহাসিক গড় প্রবৃদ্ধি এর ধারেকাছেও নয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেটের আগেই সতর্ক করেছিলেন, অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও অতিরিক্ত উন্নয়ন ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে।
ঘাটতি অর্থায়নের ছবিও স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে; সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এর কারণ দেখিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, কেনাকাটায় বিলম্ব ও দাতাদের শর্ত পূরণে প্রশাসনিক জটিলতা। এই বাস্তবতায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক অর্থছাড়ের প্রত্যাশা অতি আশাবাদ। রাজস্ব না এলে এবং বৈদেশিক অর্থ না ছাড়লে পুরো চাপ পড়বে ব্যাংক খাতে, যেখানে খেলাপি ঋণ ইতিমধ্যে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। সরকার লক্ষ্যের বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মূল প্রতিশ্রুতিকেই দুর্বল করবে এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রস্তাবিত বাজেট