সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ধসে পড়া সৃজনশীলতা

বিডি নিউজ ২৪ কামরুল হাসান বাদল প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:১৮

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রামোফোন ও রেডিও দুটিই বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এর আগে পরোক্ষভাবে শব্দ শোনার অভিজ্ঞতা মানুষের ছিল না। তখন সামনাসামনি থেকে কথা, গান ও অন্যান্য কিছু দেখা ও শোনার অভিজ্ঞতা থাকলেও গ্রামোফোন আবিষ্কারের পর মানুষ প্রথম শুনল রেকর্ড করা গান ও কথা। আবিষ্কারের মাত্র ১৫ বছরের মাথায় ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে গ্রামোফোনের রেকর্ডিং শুরু হয়। ১৯০২ সালের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জমিদারবাড়ি ও বনেদি পরিবারগুলোতে গ্রামোফোনের ব্যবহার শুরু হয়। পরে ১৯২৮ সালে কলকাতার দমদমে গ্রামোফোন কোম্পানির স্থায়ী কারখানা গড়ে উঠলে এ দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাধারণের নাগালের মধ্যে চলে আসে।


অবিভক্ত ভারতে প্রথম রেডিওর ব্যবহার শুরু হয় ১৯২৩ সালে 'রেডিও ক্লাব অব বোম্বে'র উদ্যোগে। তবে এই বাংলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক ও নিয়মিত বেতার সম্প্রচার শুরু হয় ১৯২৭ সালের ২৬ অগাস্ট কলকাতার 'ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি'র মাধ্যমে।


বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম রেডিও স্টেশন বা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় (পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে)। ১ কিলোওয়াটের একটি মাঝারি তরঙ্গের ট্রান্সমিটার দিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রের সম্প্রচার শুরু হয়েছিল, যার পরিধি ছিল মাত্র ৪৫ কিলোমিটার।


এটা গেল শোনার ইতিহাস। দেখার ইতিহাসটা শুরু হলো টেলিভিশন শুরুর সঙ্গে, ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। শুরুতে ঢাকার অভিজাত কিছু পরিবারেই শুধু টিভি দেখার সুযোগ ছিল।


তবে গত শতকের সাতের দশকের শেষ ও আটের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে টেলিভিশন জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ওই সময় অবশ্য ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যাদের ঘরে টেলিভিশন ছিল, সেখানে সন্ধ্যার পর ভিড় জমত। বেশিরভাগই ছিল সাদাকালো টিভি। ১৯৭৯ সালে বিটিভি রঙিন জগতে প্রবেশ করলেও আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মধ্যবিত্তের নাগালে ছিল না রঙিন টিভি। আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যায়। তার আগে বিনোদনের প্রধান অবলম্বন ছিল সিনেমা। আর তারও আগে থেকে যাত্রাপালা, সার্কাস, পাড়ার নাটক, জাতীয় দিবসগুলো উপলক্ষে পাড়ার সংগঠনগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই ছিল বিনোদনের ক্ষেত্র। গ্রামে মৌসুমি মেলা, বলীখেলা, গরুর লড়াই, নৌকা বাইচের মতো বিষয়গুলোও ছিল।


শুরুর দিকে, অর্থাৎ টেলিভিশন যখন ঘরে ঘরে ছিল না, সে সময় সাপ্তাহিক নাটক, সিনেমা ও সিনেমার গান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান 'ছায়াছন্দ' যেদিন থাকত, সেদিন টেলিভিশন আছে এমন পরিবারে মোটামুটি একটি পুনর্মিলনী হয়ে যেত। অবশ্য এটা অনেক সময় বিরক্তির কারণও হয়ে উঠত কারো কারো কাছে।


তারপর দিন বদলাতে থাকে। প্রায় প্রতিটা ঘরে টেলিভিশন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো স্থান পেতে শুরু করে। রঙিন যুগ আগেই শুরু হয়েছিল, এবার যুক্ত হলো ভিসিআর। আগে দলবেঁধে যেমন টিভি দেখা হতো, সেভাবে ভিসিআরে হিন্দি, ইংলিশ ও ওপার বাংলার ছবি দেখা শুরু হলো। এরপর নব্বইয়ের দশকে ভিসিআরের ক্রেজ দখল করল টিভি সিরিয়াল। ক্যাবল টিভির সুবাদে ভারতীয় টিভির কিছু সিরিয়াল এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে, তা দেখার সময়ে পরিবারের অনেকে—বিশেষ করে নারীরা এতই নেশাগ্রস্ত ও মগ্ন থাকতেন যে, সে সময়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া বা ঘরে কোনো অতিথি আসা বন্ধ হতে থাকল। এভাবে অসামাজিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছায় নয়া শতকের শূন্যের দশক ও পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে। এখন এটি ভয়াবহ এক পারিবারিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই এই ভার্চুয়াল জগতের মোহ কাটাতে পারছেন না। নামে 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম' বলা হলেও এটি মানুষকে চরমভাবে অসামাজিক করে তুলেছে। ফেইসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রতিক ক্রেজ হলো টিকটক ও রিলসের মতো অতি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি, এর ভয়াবহ পরিণতি এবং পরিত্রাণের উপায় নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে, প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। অনেক তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে।


দেড়-দু বছর আগে একদিন সেলুনে চুল কাটানোর সময় লক্ষ্য করলাম, এক তরুণ ফোনে কিছু একটা দেখছে খুব দ্রুততার সঙ্গে। এক-দুই সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে শব্দ। আমি যেহেতু তার স্ক্রিনটা দেখতে পাচ্ছি না, তাই শব্দে বুঝতে পারছি দ্রুত সে বিষয় পাল্টাচ্ছে। হাসির শব্দ শোনার দু সেকেন্ড পর শুনছি কান্নার শব্দ, তারপর শুনছি মারামারির শব্দ, তারপর গাগালালি—এভাবে সে দ্রুত কিছু দেখছিল। তখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার পদচারণা ফেইসবুক পর্যন্তই। ফলে আমি বুঝতে পারছিলাম না, এভাবে সে কী দেখছে। পরে ঘরে এসে জানলাম, সেটাই রিলস বা টিকটক। এখন হাটে-মাঠে-বাজারে, বাড়িতে-গাড়িতে, আড্ডায়, দোকানে, গাছের নিচে, চলন্ত টেম্পুতে—প্রায় সবাইকে দেখা যায় মাথা নিচু করে আছে। আমার মতো বোকা কিসিমের কেউ দেখে ভাববে, এরা কত বিনয়ী! কিন্তু বাস্তবে তারা মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। আমি লক্ষ্য করি, অনেক দূর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে বসে ঘণ্টাকয়েক ফেইসবুক চালিয়ে যার যার মতো বাড়ি ফিরে যেতে।


কয়েক মাস আগে ৭১টি গবেষণার মোট ৯৮ হাজার ২৯৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম রিলসে অতিরিক্ত ডুবে থাকার ঘটনায় মানুষের মনোযোগের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যত বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দেখার ঘটনা ঘটতে থাকবে, ততই মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যাবে। যে কাজগুলোতে গভীর মনোযোগ বা মানসিক শ্রম দরকার, সেগুলো তাদের কাছে আরও জটিল হয়ে উঠবে। গবেষকদের মতে, উত্তেজনামূলক ও দ্রুতগতির কনটেন্ট বারবার দেখলে ব্যবহারকারীরা ‘হ্যাবিচুয়েশন’–এ ভোগে। এতে ধীরে চলা কিংবা বেশি পরিশ্রমের কাজ—যেমন পড়াশোনা, সমস্যা সমাধান বা গভীরভাবে শেখার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। গবেষকরা বলছেন, এটি মানুষকে ‘ব্রেইন রট’ বা ‘মস্তিষ্কের পচনের’ দিকে ঠেলে দেয়। অতি সম্প্রতি অক্সফোর্ড ডিকশনারি ‘ব্রেইন রট’ শব্দটিকে অভিধানে স্থান দিয়েছে। তারা বুঝিয়েছে—অতিরিক্ত তুচ্ছ বা মানহীন অনলাইন কনটেন্ট গ্রহণের ফলে মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অবনতি। গবেষকদের মতে, ‘বিরতিহীন সোয়াইপ ও নতুন, আবেগতাড়িত কনটেন্ট পাওয়ার চক্র মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা এক ধরনের রিইনফোর্সমেন্ট লুপ তৈরি করে এবং এই অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে।’ সেই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শর্টফর্ম ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের মনোযোগ, প্রতিরোধক্ষমতা, ভাষা, স্মৃতি ও ওয়ার্কিং মেমরিসহ বিভিন্ন বিশ্লেষণ দক্ষতায় অবনতির সম্পর্ক রয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও