বাজেট: কেবলই সংখ্যার খেলা, নাকি জনগণের সঙ্গে নতুন চুক্তি?
জাতীয় বাজেটকে সাধারণত বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় স্বভাবতই রাজস্ব আহরণ, রাজস্ব ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। তবে বাজেট কেবলই একটি বার্ষিক আর্থিক দলিল নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক চুক্তিও বটে। এই দলিলের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়—একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার সীমিত সম্পদ ও বহুমুখী চাহিদার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মাঝে সম্পদ বণ্টন করে এবং নাগরিকদের সামগ্রিক ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করে। অতএব, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট কেবলই অঙ্ক মেলানো বা টাকা গণনার বিষয় নয়, এটি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার পরিমাপের একটি অন্যতম মাপকাঠি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯.৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার জাতীয় বাজেটটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। এই বাজেটে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সামগ্রিক ব্যয় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যার মধ্যে উন্নয়ন খাতের ব্যয় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩.১৬ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৯৫ ট্রিলিয়ন টাকা ধার্য করায় বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২.৪৩ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমতুল্য। সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এটিকে "একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা" হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামষ্টিক অর্থনীতির এই পরিসংখ্যানগুলো নিঃসন্দেহে সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্নটি হলো—এই আর্থিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কতটা রূপান্তরিত হতে পারবে।
এই বাজেটের সময়কালটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ এখন এমন একাধিক অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এর কোনো কার্যকর সুফল দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৯.০৬ শতাংশ এবং ৯.৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে সবচেয়ে সংকটের দিক হলো, গ্রামীণ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির হার (৯.৪৮ শতাংশ) শহরাঞ্চলের চেয়েও বেশি। এই চিত্রটি প্রমাণ করে যে, মূল্যবৃদ্ধির এই তীব্র আঘাত মূলত প্রান্তিক ও নিম্ন-আয়ের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি সামাজিকভাবে বৈষম্য তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের কাছে মুদ্রাস্ফীতি একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক হলেও সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এটি একটি জীবন্ত সামাজিক বাস্তবতা। মূলত মুদ্রাস্ফীতিই নির্ধারণ করে একটি পরিবার পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন ও আবাসনের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোর ব্যয়ভার বহন করতে পারবে কি না। যখন মুদ্রাস্ফীতির গতি ধারাবাহিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সামাজিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, বাংলাদেশে নিম্ন-আয়ের শ্রমিকদের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, যার ফলে তাদের সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে এর অর্থ হলো—লাখ লাখ মানুষ আগের মতোই কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের উপার্জন দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সমাজে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করে এবং অনিবার্যভাবে সামাজিক বৈষম্যকে ত্বরান্বিত করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বাজেট