ভারতীয় হাইকমিশনারকে সুস্বাগত ও অন্যান্য
গত শুক্রবার ১২ জুন মহান ভারতের মহান হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী যশোরের বেনাপোল-পেট্রাপোল হয়ে সড়কপথে ঢাকায় এসেছেন। বহুদিন পর একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের হৃদয় জয় করতে এলেন।
ভদ্রলোককে দু-তিনবার দেখেছি। তখন তিনি এত বড় ছিলেন না, নামডাকও ছিল না, যখন জর্জ ফার্নান্ডেজ, ওড়িশার বিজু পট্টনায়েক, জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাই, চরণ সিং, চন্দ্র শেখর, জগজীবন রাম, মধু লিমায়ে, হেমবতী নন্দন বহুগুনা, নানাজি দেশমুখ, অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি, কর্পূরী ঠাকুর, রাজনারায়ণ, মোহন ধাড়িয়া, ইটনার ভুপেস দাসগুপ্ত, সমর গুহ, শান্তিময় রায়, কমলাপাতি ত্রিপাঠী, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, অশোক সেন, গণি খান চৌধুরী, দেবকান্ত বড়ুয়া, যশোবন্ত রাও চৌহান, শরদ পাওয়ার, জ্ঞানী জৈল সিং, বসন্ত শাঠে, দেবীলাল, ভজন লাল, মাধব রাও সিন্ধিয়া, প্রণব মুখার্জি, অজিত পাঁজা, প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সি, সোমেন মিত্র, সুব্রত মুখার্জি ও নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে উঠাবসা করেছি। উনার মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু আমার মনে আছে। তাই এই সময় যখন সবচেয়ে ক্ষুরধার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ একজন মানুষের প্রয়োজন, তখন বোঝা যায় ভারত কতটা গুরুত্ব দিয়ে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন যথাযোগ্য মানুষকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার করে পাঠিয়েছে।
আমরা বহু বছর সুখ, শান্তি ও সম্প্রীতিতে কাটিয়েছি। সেটি হাজার বছরের কম হবে না। কিন্তু ইংরেজ আমাদের শান্তিতে, সম্প্রীতিতে থাকতে দেয়নি। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ঘটিয়ে তারা দারুণ মজায় শাসন করেছে। মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি করেছে উনিশ শতকে। এই বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটাই দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব আর দ্বন্দ্ব। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে সেটি আবার চরম আকার ধারণ করে। তারপর প্রায় সময়ই দ্বন্দ্ব লেগে থেকেছে। কিন্তু ছোটখাটো কিছু দ্বন্দ্ব থাকার পরও ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে মুসলমানদের পুরোপুরি পিছে ফেলতে পারেনি।
সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো বেড়ে যায়। পাকিস্তানিরা সব সময় ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করে। চাণক্যের দেশ ভারত, কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে যতটা করার তা করেনি। ভারত একটি প্রতিষ্ঠিত কৃষ্টিসভ্যতার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতির দেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের যতটা সম্মান-সহমর্মিতা পাওয়ার কথা, তা পায়নি। আজ ভারতের যে উত্থান, সে উত্থানে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই—এটি যাঁরা ভাবেন, তাঁরা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৩-২৪ বছর পাকিস্তানিরা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ভারত কোনো মানবের নয়, দানবের দেশ। শুধু একাত্তরে ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডিত অন্তরাত্মা নিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে প্রায় কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে ক্যাম্পে ক্যাম্পে কঠিন পরিবেশে তারা ভারতের হৃদয় দেখার বা বোঝার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে ভারতও বাংলার মানুষের অন্তরাত্মা স্পর্শ করতে তেমন চেষ্টা করেনি, বরং আমরা ছিলাম বিদেশিনির্ভর। আমরা ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, আমেরিকার জিনিসপত্র ব্যবহার করতাম। চীনের জিনিসপত্রের প্রতি তখন আমাদের তেমন আকর্ষণ ছিল না। সেই সময় প্রায় সবকিছুই যখন ভারত থেকে আসে, ভারতের নিম্নমানের জিনিস আমাদের চোখে লাগতে থাকে।
ষড়যন্ত্রকারীরা বলা শুরু করে, ভারত বাংলাদেশকে বাজার বানাতে তাদের দেশের পচা মাল চালাতে আমাদের সাহায্য করেছে। হ্যাঁ, এর যে কোনোই সত্যতা নেই, তা নয়। কিছু ভারতীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তাঁদের পচা মাল আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বেশিসংখ্যক আমাদের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ভারতের বাজারের নিম্নমানের দ্রব্য, যা তাদের বাজারেই চলেনি, তা এনে আমাদের বিভ্রান্ত করেছেন। সেই সময় ওইভাবে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে এমন হতো না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর স্বাধীনতার স্বপ্নই অনেকটা ওলটপালট হয়ে যায়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর আবার বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা ক্ষমতায় এলে ভারতের দৃষ্টি পুরোটাই বাঙালি জাতির ওপর না দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ওপর দেওয়া হয়—এটি ভারতের জন্য মারাত্মক ভুল। নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবার প্রতি তাদের একই রকম আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা তারা করেনি বা করতে পারেনি। বাংলাদেশে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার হয়েছিলেন আমার টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনীর ছাত্র সুবিমল দত্ত। তারপর সমর সেন। একজন অত্যন্ত ভালো হাইকমিশনার এসেছিলেন বিহারের মাইথনের মুচকুন্দ দুবে। এরপর একজন চমৎকার মহিলা এসেছিলেন বীণা সিক্রি। অভাবনীয় তৎপর যথার্থ একজন ভারতীয় হাইকমিশনার। তারপর মনে হয় এই এলেন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় ভরপুর চাণক্যের দেশের প্রকৃত প্রতিনিধি দিনেশ ত্রিবেদী। দেখা যাক তিনি কী করেন।
ভারতের প্রতি যতটা ক্ষোভ বাংলাদেশের মানুষের, তার চেয়ে অভিমান অনেক বেশি। আর নতুন নেতারা ভারতকে যত তাচ্ছিল্যই করুন, যত খারাপই বলুন, বাংলাদেশের প্রাণ ভারতকে সম্মান করে, ভারত ভারতের মহান প্রাণ বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আজও আলোড়ন তোলে। কিন্তু এই কয়েক দিন সীমান্তে যা হচ্ছে, তা বলার মতো নয়। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষকে পুশ ব্যাক করার ভারতের চিন্তা বা চেষ্টা খুবই হাস্যকর। এমনটা ভারতের জন্য মানায় না। ঠিক আছে, ভারত যাদের ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে, তারা যদি ভারতের বোঝা হয়ে থাকে, সরকারি হিসেবে তদন্ত করা হোক। মিথ্যা তদন্ত নয়, সেখানে সত্য থাকতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সরকার যেকোনো জায়গায় বসে তদন্ত করুক, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। একসময় আমরা কিন্তু সবাই ভারত উপমহাদেশেরই ছিলাম। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার জন্মভূমি ভারতবর্ষ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে। এতে আমরা খুবই ঋণী। কিন্তু আমাদের জন্য যে ভারতের তেমন লাভ হয়নি, উপকার হয়নি; এটিও সত্য নয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগে ভারতের থলিতে কোনো সশস্ত্র বিজয় ছিল না। আটচল্লিশে কাশ্মীরে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত একেবারে নাস্তানাবুদ হয়েছিল। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হয়। সেখানেও ভারত তেমন সুবিধা করতে পারেনি। একমাত্র ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বিজয় পতাকা হাতে পেয়েছিল ভারত। আজ ভারত এক পরাশক্তি। ব্যাপারগুলো ভারতের হৃদয়কে, যাঁরা ভারতকে চালান, তাঁদের ভেবে দেখতে বলছি। দেখা যাক, দিনেশ ত্রিবেদী কতটা কী করতে পারেন। আমরা সবাই ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক যারা চাই, তারা দুই হাত প্রসারিত করে বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় থাকলাম।
অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই প্রথম বাজেট পেশ করেছে। চিরাচরিত নিয়মের মতো হয়ে গেছে। বাজেট পেশ করে সরকারি দল সেটি যত খারাপই হোক, বলবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাজেট, ঠিক তেমনি বিরোধী দল সত্যিকার অর্থে অতি উত্তম বাজেটকেও বলবে একেবারে অখাদ্য, এটি কোনো বাজেটই হয়নি। এ এক অলঙ্ঘনীয় রীতির মতো হয়ে গেছে। আমি এখন বিরোধী দলেও না, সরকারি দলেও না, একেবারে সাধারণ মানুষ। আমার কাছে এই বাজেটকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া কাগজের মতো মনে হয়নি। যতটা সম্ভব যথার্থই হয়েছে। দেশের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ বাজেট বোঝে না, বাজেট নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথাও নেই। তাদের ব্যথা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোক্রমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারবে কি না।
বাংলাদেশের প্রথম বাজেট হয়েছিল ৫৭৮ কোটি টাকা। আর এবারের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কোথায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি আর কোথায় ৫৭৮ কোটি! এই বিপুল বাজেট নিয়ে আমার তেমন ভাবনা নেই, আমার ভাবনা এই বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে। তবে একটি বিষয় আমার খুবই অবাক লেগেছে, ট্যাক্স প্রত্যাহারেও বিরোধী দল নিন্দা করেছে। ৬০টি দ্রব্যের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়েছে বর্তমান সরকার। আর বাজেটের পরমুহূর্তে প্রতিবছরই নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ে। এবার আহামরি তেমনটি হয়নি। এটি নিশ্চয়ই বাজেটের সফলতা। এ জন্য অবশ্যই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অভিনন্দন জানাতে হয়। সেই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দলের না খাওয়া কর্মীদের সামলাতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তিনি সাধুবাদ পাবেন এবং এর ফলও দেখতে পাবেন। সরকারে এবং বিরোধী দলে কোনোখানে না থাকায় মুক্তমনে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে মানুষের সরকার হিসেবে, জনগণের সরকার হিসেবে অভিনন্দন জানাতে চাই।