একটি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। রাজনৈতিক দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সর্বদাই ক্ষমতার পৃথক্করণের কথা বলে আসছেন।
নাগরিকের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে এবং বিচার বিভাগকে আইন ও নির্বাহী বিভাগের থাবা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে।
বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে, যেখানেই বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা হয়েছে, সেখানেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
বিপরীতে, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সব সময়ই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই দর্শন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধারণ করা হয়েছিল।
যদিও ওই সংবিধানেরই ৭০ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীকে এমনই একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে তাঁর কাছে কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য থাকলেই ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই সংবিধান সংশোধন করে, এমনকি বাকশালও (চতুর্থ সংশোধনী) কায়েম করা যায়।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ক্ষমতার মসনদে যখনই যে দল বসেছে, তারা মুখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্লোগান দিলেও কার্যত একে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ–সংক্রান্ত আইনি ও রাজনৈতিক নাটকীয়তা এই নির্মম সত্যকে আবারও দেশের জনগণের সামনে উন্মোচন করেছে। আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আদালতেরই হাত-পা বেঁধে ফেলার সেই চিরচেনা রাজনৈতিক খেলা যেমন পরিহাসের, তেমনি গভীর উদ্বেগের।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর, যখন সাত আইনজীবীর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। এই রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাতিল ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল সুপ্রিম কোর্টের ওপর। পরবর্তীকালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়, যা বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়।
যদিও পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে’ কথাটি যুক্ত করা হয়, তা সত্ত্বেও কার্যত তা নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থেকে যায়। হাইকোর্ট এই প্রশাসনিক চাবিকাঠি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও পৃথক ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার জন্য তিন মাসের সময় বেঁধে দেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা