ভারতের মুর্শিদাবাদ ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাঝামাঝি বৃষ্টিভেজা এক সরু ভূখণ্ড। কাগজে-কলমে এটি নো-ম্যানস ল্যান্ড-কোনো দেশেরই নয়। সেখানে খোলা আকাশের নিচে ক্ষুধার্ত শিশুদের বুকে আগলে বসে আছেন কয়েকজন নারী ও বৃদ্ধ। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থানে সতর্ক। বর্ষার বৃষ্টি নিরন্তর ঝরে পড়ছে, যেন রাষ্ট্রের সীমানা কিংবা মানুষের দুর্ভোগ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।
এ দৃশ্য শুধু কয়েকজন মানুষের দুর্দশার গল্প নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় নাগরিকত্ব, পরিচয়, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আমাদের বাধ্য করছে একটি মৌলিক প্রশ্ন করতে-রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি মানুষের মৌলিক মর্যাদাকেই বিসর্জন দিচ্ছি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে দুই দেশে ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে অনেকেই সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নেওয়া স্থানীয় জনগণ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ভূমিকার প্রশংসা করছেন। ভারতে আবার কথিত অবৈধ অভিবাসন দমনে কঠোর অবস্থানের প্রতি সমর্থন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ দুই বয়ানের মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে সীমান্তে আটকে পড়া মানুষগুলোর গল্প-যাদের জীবন রাজনৈতিক বিতর্ক ও জাতীয়তাবাদী আবেগের আড়ালে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল সীমান্ত হিসাবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ একাধিক ক্ষেত্রে এমন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে। এর ফলে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অনেক মানুষ শূন্যরেখা এলাকায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে এ সংকটকে শুধু ‘অবৈধ অভিবাসন’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে মূল সমস্যাটি ধরা পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে কিছু মানুষকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ক্রমশ ‘অবাঞ্ছিত’ হিসাবে দেখা হচ্ছে। তাদের জীবন, অধিকার এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর আলোচনার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে প্রায়ই নিরাপত্তা ঝুঁকি বা জনসংখ্যাগত হুমকি হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশও নাগরিকত্ব নিশ্চিতভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসাবে গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নেয়। ফলে দুই রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে কিছু মানুষ কার্যত পরিচয়হীন অবস্থায় আটকে পড়ে। তারা এক দেশের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত, অন্য দেশের কাছে অস্বীকৃত।
এ পরিস্থিতি আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারের প্রশ্নও সামনে আনে। কোনো রাষ্ট্রেরই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আইনের শাসন, স্বচ্ছতা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মিত অভিবাসনের অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও ন্যায্য শুনানি, পরিচয় যাচাই এবং মৌলিক মানবিক সুরক্ষার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সহিংসতার প্রশ্নও নতুন নয়। বহু বছর ধরে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সীমান্তে হতাহতের ঘটনা নথিভুক্ত করে আসছে। দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে এসব ঘটনা কমানোর অঙ্গীকার বারবার করা হলেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বলপ্রয়োগের অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক।
ভারতের অন্যান্য সীমান্তের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ সীমান্তের বিশেষ চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত। চীনের সঙ্গে সীমান্ত অত্যন্ত সামরিকীকৃত হলেও সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ন্ত্রিত। পাকিস্তান সীমান্তও কঠোর নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্ত একযোগে ঘনবসতিপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে আন্তঃনির্ভরশীল এবং পরিচয় ও অভিবাসন প্রশ্নে গভীরভাবে রাজনৈতিক।