টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান জরুরি
মানব সভ্যতার অগ্রগতি আর প্রকৃতির ভারসাম্য আজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে হিমবাহের গলন, অসময়ের তাপদাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা।
এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে বিশ্ববাসীকে এক সুতায় বাঁধতে প্রতি বছর ৫ জুন আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত স্টকহোম সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য ও স্বাগতিক দেশের অধীনে উদযাপিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশভিত্তিক গণসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ১৫০টিরও বেশি দেশের কোটি কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করে। ২০২৬ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বৈশ্বিক অনুষ্ঠানের স্বাগতিক দেশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে আজারবাইজানের বাকু শহর। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের সমাধান খুঁজতে এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’
২০২৬ সালের এই প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি জটিল পরিবেশগত সমস্যার সমাধান কৃত্রিম কোনো উপায়ে নয়, বরং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম ও নকশার মধ্যেই নিহিত রয়েছে।
মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষুধা প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দ্রুত শিল্পায়নের কারণে পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত বনাঞ্চলগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অ্যামাজন থেকে শুরু করে আমাদের সুন্দরবন পর্যন্ত সবখানেই মানুষের কুঠারের আঘাত লেগেছে। বনের গাছ কাটার ফলে কেবল কার্বন শোষণের ক্ষমতাই কমছে না, বরং মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে নদী, নালা ও সমুদ্রের পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। শহুরে অঞ্চলের কংক্রিটের জঙ্গল সূর্যের তাপ শোষণ করে ধরে রাখছে, যাকে পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব বলা হয়।
এর ফলে শহরের তাপমাত্রা আশেপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি থাকছে, যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে আরও বেশি কার্বন নির্গমনের চক্র তৈরি করছে। আমরা যদি আজ কার্বন নিঃসরণ না কমাই, বন রক্ষা না করি এবং পানির উৎসগুলো দূষণমুক্ত না রাখি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জ্বলন্ত ও বাস-অযোগ্য পৃথিবী রেখে যাব। পরিবেশগত এই বিপর্যয় কেবল প্রকৃতির ক্ষতি করছে না, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও ধ্বংস করছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তাল রূপের মাঝখানে অবস্থিত এই বদ্বীপ প্রতিনিয়ত বন্যা, নদীভাঙন, খরা এবং লবণাক্ততার শিকার হচ্ছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড মাত্রার তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা, চরাঞ্চল এবং নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর ‘জলবায়ু কর্মকাণ্ড’ প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জলবায়ু কর্মকাণ্ড বলতে মূলত এমন সব উদ্যোগকে বোঝায় যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ কমাতে এবং এর প্রভাব মোকাবিলা করতে সহায়তা করে। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, শক্তি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বনায়ন, জলাভূমি সংরক্ষণ, টেকসই কৃষি, সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক অবকাঠামো নির্মাণ।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক দেশ বৈদ্যুতিক যানবাহন, সবুজ ভবন এবং কার্বন নিরপেক্ষ উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করছে। এসব উদ্যোগ শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।