মবের শাসন, মানুষের ভয়, রাষ্ট্রের নীরবতা

www.ajkerpatrika.com কামরুল হাসান প্রকাশিত: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:০২

দেশে এখন একটি ভয়ংকর প্রবণতা ক্রমেই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কোনো ব্যক্তি চুরির অভিযোগে ধরা পড়ছেন, কাউকে ডাকাত বলে সন্দেহ করা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করেছেন কিংবা কোনো তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডায় কেউ জড়িয়ে পড়ছেন—ব্যস, একদল উত্তেজিত মানুষ মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ, আইন-আদালতের কোনো ধার ধারছেন না কেউ। লাথি, ঘুষি, রড বা লাঠির আঘাতে অভিযুক্ত মানুষটিকে মেরেই ফেলা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় বা তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের ভিত্তি যাচাইয়েরও প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে না।


এ দেশে গণপিটুনির সংস্কৃতি বহু পুরোনো। কিন্তু আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসানের পরপরই আইনশৃঙ্খলার অবনতির মধ্যে ভিন্ন মাত্রা ও পরিসরে এ ধরনের ঘটনা রাতারাতি বেড়ে যায়। লোকমুখে ও গণমাধ্যমে এই ভয়ংকর প্রবণতার নাম হয়ে ওঠে ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো বিচার নয়; এটি পরিষ্কারভাবেই আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।


মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত মে মাসের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক বললে হয়তো কম বলা হবে। বস্তুত এটি রাষ্ট্রের জন্য এক বিপৎসংকেত। মে মাসে সারা দেশে ৬৯টি ‘মব’ সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন ৭১ জন। গত ছয় মাসের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে, যখন বলা হচ্ছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের নাজুক পরিস্থিতি থেকে পুলিশ বাহিনী বেশ আগেই বের হয়ে এসেছে, তখনই মব সন্ত্রাসের গ্রাফের রেখা আবার ঊর্ধ্বমুখী।


এমএসএফের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নিহত হন ১০ জন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ২১, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯, এপ্রিলে ২১ এবং মে মাসে অন্তত ৩২ জন। অর্থাৎ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গত কয়েক মাস মোটের ওপর স্থিতিশীলভাবে ঘটে চলেছে এবং শেষ মাসটিতে অনেকটাই বেড়েছে।


একটি স্বাধীন দেশে যদি মাত্র এক মাসেই অন্তত ৩২ জন আদালতের রায় ছাড়া, বিচারকের আদেশ ছাড়া, রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর বাইরে শুধু উত্তেজিত জনতার হাতে নিহত হন; তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আসলে আইনি কর্তৃত্ব কার হাতে? রাষ্ট্রের নাকি উন্মত্ত জনতার?


রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক ধারণাগুলোর একটি হলো—শাস্তি দেওয়ার বৈধ ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের, অন্য কারও নয়। নাগরিকেরা সেই ক্ষমতা রাষ্ট্রকে অর্পণ করে। বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতেই আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। অরাজকতার অবসান ঘটে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্থিতিশীলতা। এই একবিংশ শতকে এসে যখন উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিজেরাই অপরাধের বিচারকের দায়িত্বে বসে যায় এবং নিজেরাই শাস্তি কার্যকর করে, তখন সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।


মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেখা গেছে, মবের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জনকে চুরির অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যত বড় চুরির ঘটনা ঘটুক না কেন, বাংলাদেশের আইনে কি এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে? নিশ্চয়ই তা নয়। তাহলে জনতা কোন আইনের ভিত্তিতে এই ‘সাজা’ কার্যকর করল? আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব ঘটনার একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি পরে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ারও নজির রয়েছে।


বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যুগ যুগ ধরে গুজব শুনে, শিশু চোর সন্দেহে বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্দোষ ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। কিন্তু একজন মানুষকে মেরে ফেলার পর তাঁর আর নির্দোষ প্রমাণ হলেইবা কী! অন্যায়টি সংশোধনের কোনো সুযোগ তো আর থাকে না।


সমাজে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বাড়ছে কেন? এর প্রথম কারণ বিচারব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক আস্থাহীনতা। এ দেশের বিচারব্যবস্থা নানা সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত। মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বহু পুরোনো। মানুষ যখন দেখে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে ১০ বছর লেগে যায়, ধর্ষণের মামলার রায় পেতে যুগ পার হয়ে যায়, তখন সমাজের একাংশের মধ্যে রাষ্ট্রের আইনকে অকার্যকর মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। দিনে দিনে সেই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও