আগুনে উধাও প্লাস্টিক, বিষে ভরছে শহরের বাতাস

বিডি নিউজ ২৪ মুনতাসির মামুন প্রকাশিত: ০৩ জুন ২০২৬, ২১:৩১

সকালের শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার পাশের দোকানগুলো ধীরে ধীরে খুলছে। এমন সময় রাস্তার মাঝখানে ছোট্ট একটি আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আগুনে পুড়ছে চিপসের প্যাকেট, পলিথিন, খাবারের মোড়ক, ফোম কাপ, বাজারের ময়লা-আবর্জনা। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মানুষ পাশ দিয়ে হাঁটছে, রিকশা যাচ্ছে, দোকান খুলছে—কেউ যেন বিশেষ খেয়ালও করছে না।


ঢাকার অনেক এলাকায় এটি এখন নতুন এক নগর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সকাল, সন্ধ্যা তো বটেই, দিনের যে কোনো সময়—রাস্তার পাশে, দোকানের সামনে বা গলির মুখে জমে থাকা বর্জ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাতলা পলিথিন, খাবারের মোড়ক, চিপসের প্যাকেট, স্যাশে, ফোম বা নিম্নমানের প্লাস্টিক বর্জ্য সবচেয়ে বেশি পুড়তে দেখা যায়। অনেক এলাকায় মশা তাড়ানোর জন্যও পলিথিন বা প্লাস্টিক জ্বালানো এখন খুবই সাধারণ একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ধোঁয়া যত ঘন, মানুষ যেন তত বেশি বিশ্বাস করে যে এটি কার্যকর!


বিষয়টি প্রথম দেখায় ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা’ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু ময়লা সরানো নয়; এটি ধীরে ধীরে শহরের বাতাসকে বিষাক্ত করে তোলার একটি আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। আমরা হয়তো রাস্তার ময়লা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলছি, কিন্তু সেই ময়লাই অন্য এক রূপে আমাদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করছে।


আমাদের শহরে এখন প্লাস্টিক দূষণ শুধু নদী, খাল বা সমুদ্রের সমস্যা নয়; প্লাস্টিক এখন আগুনের মাধ্যমে বাতাসেও ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই দূষণ সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের নগর দূষণ নিয়ে আলোচনা হলে আমরা সাধারণত গাড়ির ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানা কিংবা নির্মাণকাজের ধুলাবালির কথা বলি। কিন্তু শহরের অলিগলিতে প্রতিদিন ছড়িয়ে থাকা এই ছোট ছোট আগুনগুলোর দিকে খুব কম মনোযোগ দেওয়া হয়।


এর পেছনে অবশ্য কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে। অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা অপ্রতুল। দোকানদার বা পথের ব্যবসায়ীরা দ্রুত নিজেদের আশপাশ পরিষ্কার করতে চান। তাছাড়া, নিম্নমূল্যের প্লাস্টিক বর্জ্যের কোনো কার্যকর বাজারও নেই। পিইটি বোতল, শক্ত প্লাস্টিক বা ধাতব জিনিসপত্র আলাদা করে রাখা হয় কারণ সেগুলোর বিক্রয় মূল্য আছে। কিন্তু চিপসের প্যাকেট, স্যাশে, পাতলা পলিথিন বা মিশ্র প্লাস্টিকের বাজার খুব সীমিত। ফলে এগুলো শেষ পর্যন্ত আগুনেই যায়।


এক ধরনের মানসিকতাও এখানে কাজ করে—‘আগুনে দিলেই শেষ’। চোখের সামনে ময়লা আর থাকে না, রাস্তা পরিষ্কার মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে বর্জ্য অদৃশ্য হয়ে বাতাসে মিশে যায়। আমরা বর্জ্য সরাচ্ছি না; বরং সেটিকে দৃশ্যমান অবস্থা থেকে অদৃশ্য দূষণে রূপান্তর করছি।


প্লাস্টিক পোড়ানো মানেই শুধু ধোঁয়া নয়। এর সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও সূক্ষ্ম কণা। খোলা জায়গায় প্লাস্টিক পোড়ানোর সময় ডাইঅক্সিন, ফিউরান, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তৈরি হয় অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যেগুলো বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই কণাগুলোর অনেকগুলো এত ছোট যে সেগুলো সরাসরি ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতে পারে।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব বর্জ্য পোড়ানো সাধারণত হয় জনবহুল এলাকায়—দোকানের সামনে, রাস্তার পাশে, বাসস্ট্যান্ডে বা আবাসিক এলাকার গলিতে। ফলে শিশু, পথচারী, দোকানি, রিকশাচালক—সবাই প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছে। হয়তো আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রভাব বুঝতে পারছি না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।


আমরা প্রায়ই বলি, প্লাস্টিক নদীতে গেলে পরিবেশ দূষণ হয়। কিন্তু যখন প্লাস্টিক আগুনে যায়, তখন সেই দূষণ সরাসরি মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে। নদীর দূষণ অন্তত চোখে দেখা যায়; কিন্তু বাতাসের দূষণ অনেক বেশি অদৃশ্য, নীরব ও ধীরগতির।


শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট এই আগুনগুলোও ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে, কারণ তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেশি এবং শরীর এখনও বিকাশমান।


শুধু তাই নয়, প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে যে সূক্ষ্ম কণাগুলো তৈরি হয়, সেগুলো বাতাসে দীর্ঘসময় ভেসে থাকতে পারে। অর্থাৎ, একটি ছোট আগুনের প্রভাব তার আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে আরও দূরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ঢাকার নাম আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি। এমনকি পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে আকাশের দিনেও আমাদের বায়ুর মান নিম্নগামী থাকে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও শহরের অসংখ্য ছোট ছোট প্লাস্টিক পোড়ানোর ঘটনা, সেই অদৃশ্য দূষণের অন্যতম অংশ হতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও