পাবলিক বনাম প্রাইভেট: তুলনার মানদণ্ড কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, ল্যাব ও খাবারের মান, পরিবেশ, শিক্ষকদের আচরণ ও যোগ্যতা, শিক্ষক রাজনীতি, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আমরা যারা এখানে পড়েছি, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কটূক্তি বা তির্যক সমালোচনা শুনলে এখনো মন খারাপ করি। এই শিক্ষাপীঠকে নিজের মনে করি বলেই মন খারাপ হয়। অনেক অব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে এবং স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা ও চলাফেরা করার স্পেস দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বুঝতে সাহায্য করেছে।
তাই যখন গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে তুলনা করলেন, তখন ব্যথিত হয়েছি। যদিও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। বিভিন্ন কারণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভালো গবেষণা হয়, যা অনভিপ্রেত।
প্রতিমন্ত্রী মহোদয় কি জানেন, এসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ গড়েই উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা? ম্যানেজমেন্টের বেশিরভাগই এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পার্ট-টাইম শিক্ষকদেরও প্রায় সবাই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষক। যারা রিসোর্স পারসন হিসেবে পড়াচ্ছেন, তাঁরাও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রী ছিলেন। সে কারণেই প্রতিমন্ত্রীর উচিত হয়নি এ ধরনের হঠকারী মন্তব্য করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পুরোনো। দেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বটগাছের মতো। ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাস, গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শীর্ষস্থানীয়।
গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের লেখাপড়ার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। বলা যেতে পারে, শিক্ষার মান উন্নয়নে যেভাবে বা যে পরিসরে কাজ করা দরকার, তা হচ্ছে না। ইচ্ছামতো কারিকুলাম পরিবর্তন, দলীয় শিক্ষক নিয়োগ, অদক্ষ উপাচার্য নিয়োগ এবং সরকারের সুবিধামতো নীতিনির্ধারণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পড়াশোনার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও যেসব ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করতে চান, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চান, তাঁরা যাচ্ছেন এবং বিদেশে ভালো ফলও করছেন। অনেকে চাকরি নিয়ে সেখানেই থেকে যাচ্ছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও অনেকে দেশেই বসে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৫৬টি সক্রিয় ও বিশেষায়িত গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি বছর বিদেশি সাময়িকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কাজেই জানতে ইচ্ছা করে, গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী যে বলেছেন নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যে গবেষণা করে, তার কানাকড়িও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে না—এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি চাইলেই একটি শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করতে পারেন না।