বঙ্গোপসাগরে ক্ষমতার শক্তিমঞ্চ
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমুদ্র কেবল বাণিজ্য কার্যক্রম বা নৌযাত্রার ক্ষেত্র নয়, ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এখন ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র বা ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় ভারতের সাম্প্রতিক নৌ-কূটনৈতিক তৎপরতা-বিশেষত ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ ত্রিপাঠীর মিয়ানমার সফর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বঙ্গোপসারকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশল পুনর্বিন্যাসের অংশ।
ভারতের উদ্যোগ ও আয়োজন দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ভারত ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বাড়াতে আগ্রহী। কারণ, আগামী দিনে শক্তির মানদণ্ড অনেকাংশে নির্ধারিত হবে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ, বন্দর অবকাঠামো, সামুদ্রিক নজরদারি ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্কের মাধ্যমে। এজন্য ভারত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তাদের একমাত্র ত্রিবাহিনী কমান্ডকে শক্তিশালী করছে, যা পূর্ব ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে ভারতের ‘ফরোয়ার্ড অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম’ হিসাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক অবস্থান নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে-ভারতের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় কী হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা দরকার। যেমন-প্রথমত, বাংলাদেশকে ‘সামুদ্রিক রাষ্ট্র’ হিসাবে তার জাতীয় কৌশল পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তা ছিল স্থলকেন্দ্রিক; কিন্তু এখন দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন ক্যাবল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রনির্ভর। ফলে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বৃহৎ প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আবার চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় অংশীদার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসাবে বঙ্গোপসাগরে সক্রিয়। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি নির্ভরশীলতা নয়’-অর্থাৎ বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আধুনিকীকরণ এখন বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা। বঙ্গোপসাগরে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে সামুদ্রিক নজরদারি, সাবমেরিন কার্যক্রম, সাইবার-মেরিটাইম নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক গোয়েন্দা সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়বে। তাই শুধু যুদ্ধজাহাজ ক্রয় নয়, উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি, ড্রোন প্রযুক্তি, উপকূলীয় রাডার নেটওয়ার্ক এবং তথ্যসমন্বিত নৌ-কমান্ড গড়ে তোলা জরুরি।
চতুর্থত, বাংলাদেশের উচিত আঞ্চলিক সামুদ্রিক কূটনীতিতে সক্রিয় হওয়া। BIMSTEC, IORA এবং জাতিসংঘের সামুদ্রিক কাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে ‘সহযোগিতার অঞ্চল’ হিসাবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ যদি বঙ্গোপসাগর কেবল শক্তির প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি কৌশলগত চাপের মুখে পড়বে। এজন্য বাংলাদেশকে আগাম সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি কৌশলকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। সমুদ্রসম্পদ, গভীর সমুদ্রবন্দর, মৎস্যসম্পদ, অফশোর গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সামুদ্রিক পর্যটন-এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়লেও এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সুবিধা পুরোপুরি নিতে সক্ষম হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বাংলাদেশকে কোনো শক্তি-প্রতিযোগিতার ‘ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র’ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ইতিহাস দেখায়, ছোট রাষ্ট্র যখন বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অতিরিক্তভাবে একপক্ষীয় অবস্থান নেয়, তখন তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের শক্তিমত্তা হওয়া উচিত তার ভৌগোলিক অবস্থানকে ‘সংঘাতের সেতু’ নয়, ‘সংযোগের সেতু’ হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে লাভজনক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে অনাগত ভবিষ্যতের আলোকে দূরদৃষ্টিতে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। কারণ, বঙ্গোপসাগর কেবল সমুদ্র নয়; এটি ভবিষ্যৎ এশীয় ভূরাজনীতির পরীক্ষাগার। এখানে ভারতের উপস্থিতি বাড়বে, চীনের আগ্রহও অব্যাহত থাকবে এবং পরাশক্তির অংশগ্রহণে ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতি আরও জটিল হবে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দূরদর্শী কৌশল, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। কেননা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার সামুদ্রিক ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারে তার ওপর। পাশাপাশি, বঙ্গোপসাগরের নতুন ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত কিনা, এমন প্রশ্নেরও ইতিবাচক উত্তর দিতে হবে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগর কেবল আঞ্চলিক জলসীমা পেরিয়ে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। এখানে সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ, সাবমেরিন কৌশল, নৌ-অবকাঠামো, ডিজিটাল কেবল নেটওয়ার্ক এবং সামরিক উপস্থিতির প্রশ্ন একে নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এ বাস্তবতায় ভারতের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি, চীনের বন্দরকেন্দ্রিক কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান-সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এ অবস্থায়, প্রশ্ন হচ্ছে-বাংলাদেশ কি এ নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?
সত্য কথা হলো, বাংলাদেশ আংশিকভাবে প্রস্তুত হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাবমেরিন সংযোজন, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে; কিন্তু ভূরাজনীতি এখন শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়। এটি প্রযুক্তি, তথ্য, সামুদ্রিক গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক সংযোগ ও কৌশলগত জোটের প্রশ্নও। সেই জায়গায় বাংলাদেশকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে একটি ‘কৌশলগত বাফার’ এবং একইসঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশপথ। অন্যদিকে চীনের কাছে বাংলাদেশ হলো ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক অংশীদার। ফলে ঢাকা এখন এমন এক অবস্থানে, যেখানে প্রতিটি সামুদ্রিক সিদ্ধান্ত বৃহৎ শক্তিগুলোর নজরে পড়বে।