একটি দেশের মোট উৎপাদন ও সেবার পরিমাণ কতটা বাড়ছে, তার পরিমাপ হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধি বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ে। তাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বর্তমানে সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে দেশ।
টানা চার বছর ধরে কমছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সবশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছিল দেশ। এর পর থেকেই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বসবাস। ২০২২-২৩ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে তা কমে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। অপ্রত্যাশিতভাবে সেটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার পর্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পরিস্থিতির উন্নতির স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মিললেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষয় হয়। ফলে অক্টোবর-ডিসেম্বরে দেশে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি গতিশীল রাখার গুরুত্বপূর্ণ চলকগুলোর এই সময়ে আরও অবনতি ঘটেছে।
অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার-সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ ও মন্থর শিল্প উৎপাদনের চাপে অর্থনীতি যখন দীর্ঘস্থায়ী ধীরগতির এক বাস্তবতার মুখোমুখি, তখনই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বেড়ে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।
অথচ প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক ধারা, অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের পূর্বাভাস বলছে, আগামী দুই বছরও বাংলাদেশ এই নিম্ন প্রবৃদ্ধির চক্রেই আটকে থাকতে পারে। ফলে অর্থনীতির গতি যখন ক্রমাগত শ্লথ হচ্ছে, তখন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য উল্টো একলাফে বাড়ানোর এই উদ্যোগকে অনেকেই বাস্তবতার চেয়ে প্রত্যাশার ওপর বেশি নির্ভরশীল বলেই মনে করছেন।