এ এক অশনিসংকেত

প্রথম আলো ড. সেলিম জাহান প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৬, ১৮:২২

অবস্থাটি ভীতিকর, তার চেয়েও বেশি শঙ্কার। বিষয়টিকে কখনো বলা হচ্ছে ‘অদৃশ্য মহামারি’, কখনো তুলে ধরা হচ্ছে একটি ‘প্রচ্ছন্ন অসুখ বলে’। যারা এই ব‍্যাধির শিকার, তারা চিহ্নিত হচ্ছে ‘যন্ত্র-পর্দা আসক্ত’ বা ‘যন্ত্রে বন্দী প্রজন্ম’ হিসেবে। মা–বাবা, অভিভাবক, শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ‍সহ গোটা সমাজই চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন।


ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে বিভিন্ন যন্ত্র-পর্দা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের গ্রাস করেছে—সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে যন্ত্রগুলো। এমনটাই আন্দাজ করা গিয়েছিল।


আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইসিডিডিআরবি) ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল সময়কালে ঢাকার তিনটি বাংলা মাধ্যম এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ৬ থেকে ১৪ বছরের ৪২০ জন ছেলেমেয়ের ওপর এই সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ঢাকা শহরের ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশু-কিশোর-কিশোরীরা প্রতিদিন প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় কাটায় যন্ত্র-পর্দা দেখে। প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা নির্দেশিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় চোখ আটকে রাখে পর্দায়। অন‍্য কথায়, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনই সময়সীমা লঙ্ঘন করে।


এর প্রতিক্রিয়াও সহজেই অনুমেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রতি ৩ জন শিশু-কিশোর-কিশোরীর ১ জন চোখের সমস্যায় ভুগছে; প্রতি ৫ জনের ৪ জনেরই নিয়মিত মাথাব‍্যথা হচ্ছে; ওজন বেড়ে যাচ্ছে ১৪ শতাংশ শিশু-কিশোর-কিশোরীর, প্রায় ২০ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ঘুমের ব‍্যাঘাত ঘটছে। ফলে দেখা যাচ্ছে ছেলেমেয়েদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা কিংবা চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ, নিজেকে গুটিয়ে ফেলা, পড়ায় কম মনোযোগ, খেলাধুলার প্রতি অনীহা ইত্যাদি।


নানান সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবহির্ভূত যেসব প্রতিক্রিয়া আছে, যা বর্তমান সমীক্ষায় আসেনি। প্রথমত, যন্ত্রের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় কাটালে তা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক এবং অন্তর্মুখী করে ফেলে, যা সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষকে সীমিত করে ফেলে। সর্বদা পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলে কথা বলার স্বাভাবিক প্রবণতা এবং সেই সঙ্গে আলাপচারিতার দক্ষতাও বিঘ্নিত হয়। সামাজিক মেলামেশা, অন‍্যদের সঙ্গে গল্প করা, সামাজিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণও তখন বোঝা বলে মনে হয়। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সেখানে বিঘ্নিত হয়। শিশু-কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ মানসিক বিকাশে তা কাম‍্য হতে পারে না।


দ্বিতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় চোখ রাখা বেশির ভাগ শিশু-কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলা কিংবা বইপড়ায় খুব একটা আগ্রহী হয় না। মানি, খেলার মাঠের অপ্রতুলতা আছে। কিন্তু তার পরে যেটুকু আছে, তার তো ব‍্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সমস‍্যা হচ্ছে যে যন্ত্র-পর্দায় আসক্ত ছেলেমেয়েরা মানসিকতার দিক থেকেই শারীরিক খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হয় না। একই রকম অনীহা তাদের গড় ওঠে বই পড়াতেও। ফলে বইয়ের আনন্দময় জগৎ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়।


তৃতীয়ত, যন্ত্র-পর্দায় বিশাল সময়ে কাটালে ছেলেমেয়েদের শুধু যে সে পর্দায় আসক্তি কিংবা নির্ভরতা বাড়ে তা–ই নয়, অনেক সময় সে নির্ভরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পর্দার যন্ত্রটি ছেলেমেয়েদের প্রাণভোমরা হয়ে দাঁড়ায় এবং সেটা থেকে কোনো রকমের বিযুক্তি তারা সহ‍্য করতে পারে না। নানান সময়ে দেখা গেছে যে এমন অবস্থা থেকে বহু মানসিক সমস্যার জন্ম হয়, যার ফলে অনেক অপঘাত ঘটে গেছে। ব‍্যক্তির জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এটা অনভিপ্রেত।


কেন ছেলেমেয়েরা ডিভাইসের প্রতি চরমভাবে আসক্ত? তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব তো সেখানে আছেই, যা অপ্রতিরোধ্য হলেও নিয়ন্ত্রিত করা যায় সুষ্ঠু ব‍্যবস্থাপনার মাধ্যমে। অল্প বয়সীরা বন্ধুবান্ধবের মাধ‍্যমেও যন্ত্র-পর্দায় উদ্বুদ্ধ হয়। অন‍্যান‍্যভাবে ব্যস্ত রাখার বিকল্প পন্থার অনুপস্থিতির ফলেও যন্ত্র-পর্দার দিকে তারা ঝোঁকে। মা–বাবার ব‍্যস্ততা এবং সময়ের অভাবও এখানে প্রভাব ফেলে। একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন এবং পাড়া কিংবা মহল্লার মতো সামাজিক কাঠামোর বিলুপ্তি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিশুদের খাওয়ানোর সমস‍্যা মোকাবিলায় যন্ত্র-পর্দার ব্যবহার আজ ঘরে ঘরে।


প্রশ্ন হচ্ছে, কী করা যেতে পারে? অনেকেই বলেছেন যে ছেলেমেয়েদের যন্ত্র-পর্দা সময় দিনে দুই ঘণ্টার মধ‍্যেই বেঁধে দিতে। গবেষকেরা ছেলেমেয়েদের চোখের যত্নে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট যন্ত্র-পর্দা ব্যবহারের পরে ২০ ফুট কোনো একটি বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষার কার্যকারিতার ব‍্যাপারেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে যন্ত্র-পর্দানির্ভর শিক্ষা সামনাসামনি শিক্ষার মতো কার্যকর নয়। মায়াবী নীল আলোর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে বাচ্চাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ছেলেমেয়েদের দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা করা, পাঠাগারে যাওয়া, বাগান করাও যন্ত্র-পর্দা সময় কমিয়ে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও