ককরোচ জনতা পার্টি, মিম-রাজনীতি ও তরুণদের প্রতিনিধিত্ব সংকট

বিডি নিউজ ২৪ রঞ্জন কুমার দে প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২৬, ১৮:৪৪

ককরোচ জনতা পার্টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উপস্থিতি আবার আলোচিত হলেও এর সূচনা অনেক আগে, ২০১০ সালের আরব বসন্তের সময়। সেই ঝড়ো সময় রাজনীতির চিরচেনা হিসাব-নিকাশ ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। পরে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল হয়ে এই ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভারত এবং পাকিস্তানেও নতুন রূপে দৃশ্যমান হয়েছে।


ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করার ক্ষোভ থেকে গত ১৬ মে নেটিজেন অভিজিৎ দীপকে চালু করেন ব্যঙ্গাত্মক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এটি স্রেফ মিম হিসেবে শুরু হলেও অবিশ্বাস্য গতিতে এর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ২০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, যা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকেও পেছনে ফেলেছে। বেকারত্ব ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের এই ডিজিটাল প্রতিবাদের জেরে ভারত সরকার এর এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করলেও তা দমে যায়নি। বিজেপির পক্ষ থেকে একে পাকিস্তানি ইন্ধন বলা হলেও তা ধোপে টিকেনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—পুরোনো, পোড়খাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের এই ঐক্যের ভাষা বুঝতে পারছে না কেন?


সম্ভবত এর কারণ, সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন বা ক্ষমতার পালাবদলের সাধারণ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গভীর ও কাঠামোগত ‘রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট’ তৈরি করেছে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই উপলব্ধি শক্তিশালী হচ্ছে যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের জীবন, সংকট ও আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না।


এই অবস্থায় পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর সামাজিক সম্মতি উৎপাদনের সক্ষমতা কমে গেছে। অথচ নতুন কোনো বিকল্প শক্তিও এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজনীতিতে এক ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে—যেখানে পুরোনো কাঠামো টিকে থাকলেও তার বৈধতা ক্ষয়িষ্ণু, আর নতুন কাঠামো সম্ভাবনার স্তরে থেকেও বাস্তবে অনুপস্থিত। এই দ্বৈত সংকটই এই অঞ্চলের রাজনীতিকে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


এই শূন্যতার মধ্যেই রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতিবাদের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত দলীয় রাজনীতি, সংগঠিত আন্দোলন এবং মতাদর্শিক কাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিম সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক প্রকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি এখন আর কেবল সংসদ, দলীয় কার্যালয় বা মাঠের সভায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি দৈনন্দিন ডিজিটাল জীবনের ভেতরে প্রবেশ করে এক ধরনের ‘রিয়েল-টাইম রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ তৈরি করছে।


রাজনীতির এই নতুন বহিঃপ্রকাশ কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার বড় উদাহরণ পাওয়া গেছে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে। তৎকালীন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা তরুণদের ভাষা ও আবেগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর শ্লেষাত্মক ও অপমানজনক বক্তব্যই উল্টো আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত তরুণদের অভিব্যক্তির সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার একটি স্পষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়।


তবে তরুণদের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ সবসময় সঠিক রাজনৈতিক পরিণতি পায় না, যদি না সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন আসে অথবা সেই পরিবর্তনের ধারায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি সেটাই প্রমাণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটলেও পরে তরুণদের বড় অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা দেখেছে, পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো নতুন ভাষা ও নতুন মুখ নিয়ে আবারও রাজনৈতিক কেন্দ্র দখল করতে শুরু করেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ নিজেদের প্রতারিত মনে করছে। তাদের ধারণা, রাজপথের ত্যাগ ও আন্দোলনের শক্তি শেষ পর্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকেই পুনর্গঠন করেছে।


আন্দোলনের সময় যে বিস্তৃত ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা পরে আদর্শিক বিভাজন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্ব সংকটের কারণে স্থায়ী রাজনৈতিক রূপ পায়নি। বরং আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রগতিশীল ও নারী নেতৃত্বের একটি অংশ কোণঠাসা হয়েছে, আবার কিছু অংশ মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে কৌশলগত আপসে গেছে। এই পরিস্থিতি দেখায়, স্বৈরাচারবিরোধী ঐক্য তৈরি করা সম্ভব হলেও তার ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা বেশ কঠিন।


এই শূন্যতার সুযোগে ডিজিটাল মিম-রাজনীতি ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ নতুন রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে উঠে এসেছে। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি তার বড় উদাহরণ। বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে তরুণরা তেলাপোকাকেই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছে। এটি ক্ষমতার ভাষাকে উল্টে দিয়ে অপমানকে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরের কৌশল। একইভাবে বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যঙ্গচিত্র, র‍্যাপ গান, অ্যানিমেশন ও মিম রাজনৈতিক প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও