চামড়া সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা জাতীয় অর্থনীতির রক্ষাকবচ

জাগো নিউজ ২৪ মো. জসিম উদ্দিন প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২৬, ১২:১৭

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চামড়া শিল্প একটি অমিত সম্ভাবনার নাম। তৈরি পোশাক খাতের পর এটিই একমাত্র বৃহৎ খাত, যার কাঁচামাল শতভাগ দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত। প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়, তার সিংহভাগই আসে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানিকেন্দ্রিক সরবরাহ চেইন থেকে। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণের অভাব এবং অশুভ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এই বহুমূল্য সম্পদ রক্ষা করা কেবল নিছক কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম মৌলিক রক্ষাকবচ হিসেবে একে বিবেচনা করা প্রয়োজন।


চামড়া শিল্পের বর্তমান চালচিত্র ও গুরুত্ব


বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মানসম্মত চামড়া উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাক্কালিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের চামড়ার গুণগত মান বিশ্বের সেরা দেশগুলোর তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের পর চামড়া শিল্পই হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান ও দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস। সরকার এই খাতের অমিত সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে একে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। বর্তমানে এই খাত থেকে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হচ্ছে, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।


বার্ষিক চামড়া সরবরাহ ও কোরবানি মৌসুমের পরিসংখ্যান


বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে গড়ে ২ থেকে ২.৫ কোটি পিস পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়। বছরের সাধারণ দিনগুলোতে মূলত অভ্যন্তরীণ মাংসের চাহিদা মেটাতে পশু জবাই হলেও, চামড়া শিল্পের আসল প্রাণভোমরা হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। পরিসংখ্যান বলছে, এই শিল্পের মোট কাঁচামালের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে কেবল কোরবানির তিন দিনে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BTA) মতে, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৫ লাখ এবং ছাগল-ভেড়া ৬২ লাখ। অর্থাৎ, সারা বছরের মোট যোগানের অর্ধেকেরও বেশি সংগৃহীত হয় এই স্বল্প সময়ে। এই বিশাল পরিমাণ কাঁচামাল মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ করা আমাদের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই সরবরাহ চেইনকে যদি বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে সারা বছর সুশৃঙ্খল রাখা যেত, তবে চামড়া শিল্প থেকে জাতীয় আয় বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো।


সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা: জাতীয় সম্পদের অপচয়


প্রতি বছর কোরবানির পর দেখা যায়, লবণের মূল্যবৃদ্ধি বা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অজুহাতে হাজার হাজার চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় অথবা মাটিতে পুঁতে কিংবা নদীতে ফেলা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর সংগৃহীত চামড়ার প্রায় ২০-২৫ শতাংশ গুণগত মান হারায়। একটি পশুর চামড়া ছাড়ানোর পর ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে যদি লবণ দিয়ে সংরক্ষণ না করা হয়, তবে তাতে পচন ধরতে শুরু করে। গ্রামীণ পর্যায়ে দক্ষ জনবল এবং পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহের অভাবে এই জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, যা সরাসরি আমাদের জিডিপি (GDP)-তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।


সিন্ডিকেট ও ন্যায্য মূল্যের সংকট


চামড়া শিল্পের বড় বাধা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট। কোরবানিদাতারা এবং মাঠ পর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার সঠিক দাম না পাওয়ায় এই খাতের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে এতিমখানা ও মাদরাসাগুলো, যারা চামড়া বিক্রির অর্থের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি এক ধরনের মানবিক অর্থনীতির বিপর্যয়। চামড়া সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পাওনা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত না করলে এই খাতের সংকট কাটানো অসম্ভব।


সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ


হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ। তবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির (CETP) পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এলডাব্লিউজি (LWG) সার্টিফিকেশন না পাওয়ায় আমরা ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে সরাসরি চামড়া রপ্তানি করতে পারছি না। ফলে আমাদের চামড়া কম মূল্যে নির্দিষ্ট কিছু দেশে রপ্তানি করতে হচ্ছে। অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে এই শিল্পকে দাঁড় করাতে হলে সাভার ট্যানারি এস্টেটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা অপরিহার্য।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও