পপুলিজমের মুখোশ ও অর্থশক্তির রাজনীতি: নাইজেল ফারাজ বিতর্ক
সম্প্রতি ব্রিটিশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন যুক্তরাজ্যের ডানপন্থি রাজনৈতিক দল Reform UK'র লিডার Nigel Farage–কে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ী Christopher Harborne–এর কাছ থেকে প্রায় ৫ মিলিয়ন পাউন্ড সমমূল্যের আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিষয়টি শুধু একটি অর্থনৈতিক লেনদেনের বিতর্ক নয়; বরং এটি আধুনিক পপুলিস্ট রাজনীতির প্রকৃতি, নৈতিকতা এবং শ্রেণিগত অবস্থান নিয়ে গভীর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
২) দীর্ঘদিন ধরে রিফর্ম ইউকে নিজেদেরকে “সাধারণ মানুষের দল” হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। অভিবাসনবিরোধী অবস্থান, ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ—এসব ইস্যুকে সামনে রেখে দলটি বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন গড়ে তুলেছে। ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে নিজেদেরকে “জনগণের কণ্ঠস্বর” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৌশলই ছিল তাদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
কিন্তু এখানেই জন্ম নেয় মৌলিক প্রশ্নটি —যে দল নিজেকে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তারা যদি ধনকুবেরদের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই রাজনীতির প্রকৃত চরিত্র কী?
পপুলিস্ট রাজনীতির অন্যতম পরিচিত কৌশল হলো “আমরা বনাম অভিজাতরা”—এই বিভাজন তৈরি করা। এখানে “আমরা” বলতে বোঝানো হয় সাধারণ মানুষ, যারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবহেলা কিংবা সাংস্কৃতিক উদ্বেগের মধ্যে বাস করছে। অন্যদিকে “অভিজাত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয় রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্র, করপোরেট গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা তথাকথিত ‘লিবারেল এলিটদের।
রিফর্ম ইউকে'র রাজনৈতিক ভাষ্যও এই কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। দলটি বারবার দাবি করেছে যে তারা ব্রিটেনের ‘ভুলে যাওয়া মানুষদের’ প্রতিনিধিত্ব করছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক শক্তির পেছনে রয়েছে বিলিয়নিয়ার অর্থদাতাদের প্রভাব। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—অভিজাতবিরোধী রাজনীতির আড়ালে কি আরেক ধরনের অভিজাত রাজনীতি তৈরি হচ্ছে না?
৩) এই দ্বৈততা অবশ্য নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পপুলিস্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমালোচনা রয়েছে—তারা জনগণের ক্ষোভকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করলেও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখে। লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভকে সামনে এনে ক্ষমতায় ওঠা রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায়ই পরবর্তীতে করপোরেট বা ধনী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
বাস্তবে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যখন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, আবাসন সংকট কিংবা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকে, তখন তারা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আবেগ হয়ে ওঠে সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক বিতর্ক
- রাজনীতি