ডিজিটাল ভূমিসেবা: জমি নিয়ে মামলা নয়, চাই স্বচ্ছতা
গাজীপুরের এক বৃদ্ধ কৃষক কয়েক বছর ধরে একটি নামজারি সনদের জন্য ভূমি অফিসে ঘুরছেন। জমিটি তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। ছেলেরা বিদেশে, মেয়েরা বিবাহিত। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি প্রতিবারই নতুন কোনো কাগজের তালিকা হাতে পান। কখনো বলা হয় খতিয়ানের কপি ঠিক নেই, কখনো দাগ নম্বরে অসঙ্গতি। এসব নিয়ে তার আক্ষেপ, ‘জমি আমার, কিন্তু প্রমাণ করতে গিয়েই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সংকট, ভোগান্তি ও নাগরিক অসহায়ত্বের ইতিহাস যেন ধরা পড়ে।
বাংলাদেশে জমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, ভবিষ্যৎ এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি পরিবারে জমি নিয়ে বিরোধ মানেই শুধু আইনি জটিলতা নয়, অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি, সহিংসতা, এমনকি খুনোখুনিও। তাই ভূমি প্রশাসনের আধুনিকায়ন কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নাগরিক আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই গতকাল ১৯ মে তিন দিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলা ২০২৬ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জমি বা ভূমি শুধু এক টুকরো সম্পদই নয়, বরং মানুষের জীবনে এটি একধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।’ এই উপলব্ধি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র যখন ভূমিকে কেবল রাজস্ব আদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে, তখনই প্রকৃত সংস্কারের পথ তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘আগে এসব বিষয়ে মানুষকে ভূমি অফিসে যেতে হতো। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে অধিকাংশ ভূমিসেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।’ সত্যিই, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অনলাইনে খাজনা পরিশোধ, ই-নামজারি, খতিয়ান সংগ্রহ, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং ‘ভূমি’ মোবাইল অ্যাপ চালুর ফলে নাগরিক সেবার পরিধি বেড়েছে। দেশের ৬১ জেলায় ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালুর ঘোষণাও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি সত্যিই মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পেরেছে? নাকি পুরোনো সমস্যাগুলোই নতুন ডিজিটাল কাঠামোর ভেতরে রয়ে গেছে?
বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি ভূমি জরিপ, পরবর্তী পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের চাপ—সব মিলিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা এক জটিল কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। একই জমির একাধিক খতিয়ান, ভুল জরিপ, অসম্পূর্ণ রেকর্ড, জাল দলিল, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি আজও বড় সমস্যা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিচারাধীন মামলার বড় একটি অংশই জমিজমা সংক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘আদালতে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার মধ্যে অধিকাংশই জমিজমা সংক্রান্ত।’ এই পরিসংখ্যান কেবল বিচারব্যবস্থার চাপই নির্দেশ করে না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কারণ একটি কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকলে এত বিপুলসংখ্যক মামলা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।