নৈতিক শিক্ষাভিত্তিক কর্মসংস্থান জরুরি

যুগান্তর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ১০:২৮

শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের আংশিক উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটি শুরু করতে চাই। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাঁটলেন, ঘুরলেন প্রধানমন্ত্রী’ শীর্ষক খবরে বলা হয়, গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে এক বিরল দৃশ্যপট রচিত হয়েছে। এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে হাঁটলেন, ঘুরলেন এবং হাজারো শিক্ষার্থীর শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন। হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই সেই সৌভাগ্যবান প্রধানমন্ত্রী, যিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে মিশে গিয়েছিলেন। ওইদিন ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলি চৌধুরী সিনেট ভবনে, ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর : টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাঁটতে শুরু করেন। অন্য অনেকের মতো আমিও এ বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রিয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের এমন আন্তরিক আচরণে একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ হিসাবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দল-মতের শিক্ষার্থীদের এমন সহাবস্থান সচরাচর প্রত্যক্ষ করা যায় না।


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আচরণে আমি যেমন মুগ্ধ হয়েছি, তেমনই ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির উগ্র ছাত্রদের দ্বারা সংঘটিত ন্যক্কারজনক ঘটনার স্মৃতি এখনো আমার মনে জাগরূক রয়েছে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। একদল শিক্ষার্থী জিয়াউর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। তারা মিছিলসহ নানা স্লোগান দিতে থাকে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কাছে চলে যান এবং তাদের দাবি সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের কোনো দাবি রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেনি। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রতি ঢিল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে আমার ভয় হচ্ছিল, রাষ্ট্রপতির গার্ড বাহিনী অ্যাকশনে যায় কি না। কিন্তু জিয়াউর রহমান সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দেননি। ঘটনার পর সেই রাতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, রাতের বেলা নিশ্চিতভাবেই হলে পুলিশি অভিযান চালানো হবে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, হলে কোনো ধরনের পুলিশি অভিযান চালানো হলো না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের পরও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেদিন যে অপরিসীম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা এখনো আমার মনে জাগ্রত।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি যে সৌজন্যবোধ দেখিয়েছে, এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। কারণ, একজন ছাত্র যে রাজনৈতিক দলের অনুসারীই হোক, তার কাছ থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতি অসৌজনমূলক আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না। কারণ, এ ছাত্ররাই আগামী দিনে দেশের কর্ণধার হবে। কাজেই তাদের আচার-আচরণ অত্যন্ত পরিশীলিত হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনাকালে সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের সহায়তা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজপথে নয়, সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রস্থল হবে জাতীয় সংসদ। আমরা স্বাধীনতা অর্জনের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রম করেছি, কিন্তু এখনো সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পারিনি। আগামী দিনে টেকসই এবং জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের যে কোনো মূল্যেই হোক জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা গেলে ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান করে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।


বাংলাদেশ সমস্যা-সম্ভাবনার একটি দেশ। এ দেশে যেমন নানা সমস্যা রয়েছে, তেমনই সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের সমস্যা সমাধান করে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, মানুষ রাতারাতি পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রত্যাশা করে; কিন্তু সব উন্নয়ন দ্রুত করা সম্ভব হয় না। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে ধীরে ধীরে উন্নয়ন সম্পন্ন করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সংস্কারের ব্যাপারে তার সরকারের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন।


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তিনি শুধু কর্মমুখী শিক্ষার কথা বলেননি, তিনি নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। উল্লেখ্য, নৈতিক শিক্ষা একজন মানুষের আদর্শিক চরিত্রের বিকাশ ঘটায়। একজন মানুষ যদি নৈতিক শিক্ষা অর্জন করে আদর্শবান নাগরিক হিসাবে গড়ে ওঠে, তাহলে তিনি সাধারণত দুর্নীতি-অনিয়ম থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন। এ মুহূর্তে আমাদের দেশের জন্য জ্ঞানের আলোয় আলোকিত আদর্শবান নাগরিকের খুবই প্রয়োজন। একজন উচ্চশিক্ষিত নাগরিক যদি আদর্শচ্যুত ও দুর্নীতিবাজ হিসাবে গড়ে ওঠে, তাহলে তার মতো ক্ষতিকর আর কিছু হতে পারে না। তাই শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, পাশাপাশি সৎ ও চরিত্রবান আদর্শ নাগরিক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।


নৈতিক কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা দূর করতে না পারলে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দেশে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূরীকরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এজন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আর কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো ছাড়া আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্ট করা সম্ভব হবে না।


আমি একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ হিসাবে মনে করি, শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে ইংরেজি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। শুধু পাশের হার বাড়িয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে না, যদি অর্জিত শিক্ষা গুণগত মানসম্পন্ন না হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বের হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম নয়। তারা কার্যত সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট অর্জনকারী ‘অর্ধশিক্ষিত’ মাত্র। শিক্ষা কার্যক্রমকে কোনোভাবেই দলীয়করণ করা উচিত নয়। একজন শিক্ষক কোনোভাবেই দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। শিক্ষক হচ্ছেন পিতৃতুল্য, সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ পছন্দ করতে পারেন; কিন্তু শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালে কখনোই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি-শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যোগ্যতা বা প্রয়োজনীয়তার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শুধু দলীয় বিবেচনায় এমন ব্যক্তিকেও শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে শিক্ষক হওয়ার মতো ন্যূনতম কোনো যোগ্যতা নেই। কয়েক বছর আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার পদ ছেড়ে সরকারি দলের যুবসংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে!

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও