একটি রাষ্ট্র শুধু আইন, সংবিধান ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলতে পারে না। তাকে সহজে চলতে ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জনগণের আস্থাভাজন হতে হয়। এই যে আস্থার কথা বললাম, এর সবচেয়ে দৃশ্যমান জায়গাগুলোর অন্যতমটি হলো পুলিশ প্রশাসন। দৈনন্দিন জীবনে দেশের সাধারণ মানুষ আইন-আদালত, সংসদ বা সচিবালয়ের সঙ্গে প্রতিদিন সরাসরি যোগাযোগ করে না। কিন্তু মানুষকে তার কাছের থানা, রাস্তার ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে প্রতিদিন সম্পর্কিত হতে হয়। মামলা, জিডি, বা অন্য কোনো সংকটে তাকে থানা-পুলিশের শরণাপন্ন হতে হয়। সুতরাং, পুলিশের আচরণ শুধু একটি বাহিনীর আচরণ হিসাবে দেখলে হবে না। তাকে রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রতিনিধি হিসাবে দেখতে হবে। দেখতে হবে রাষ্ট্রের মুখ হিসাবে। আইনের শাসন বলবৎ আছে কি না, পুলিশ তার স্মারক। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী ১০ মে অনুষ্ঠিত পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে পুলিশের প্রতি মানুষের রয়েছে জটিল এক অনুভূতি। বিপদে পড়লে মানুষকে পুলিশের কাছে যেতে হয়, অন্যদিকে এ বাহিনীটিকে দেখলে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। এর পেছনে রয়েছে মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, আশঙ্কা ও অসহায়ত্বের বোধ। অতএব, রাষ্ট্রকে যদি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক হতে হয়, তবে প্রথমেই পুলিশকে এ ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বের করে আনতে হবে। তাদের হতে হবে নিরাপত্তার প্রতীক। তারা যেন হন হয়রানির বিপরীতে আশ্রয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
উপমহাদেশে পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজন থেকে এটি গড়ে উঠেছিল। তারা জনগণের সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলেননি। তুলেছিলেন ঔপনিবেশিক শোষণ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসাবে। ফলে পুলিশের ঐতিহাসিক ভূমিকায় প্রয়োজনীয় চরিত্র হিসাবে স্থান পেয়েছিল নিয়ন্ত্রণ, চৌকিদারত্ব ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি। কিন্তু এখন আমরা একটি স্বাধীন দেশ। ব্রিটিশও নেই, পাকিস্তানও নেই। স্বাধীন দেশের পুলিশের ভূমিকা হতে হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা রক্ষা করবেন জনগণের অধিকার। অপরাধ প্রতিরোধ করবেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন ও সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবেন। সত্যি কথা বলতে কী, সমস্যাটা বেধেছে এখানেই। পুলিশ রয়ে গেছে সেই সনাতনী ঐতিহাসিক ব্রিটিশ মানসিকতার মধ্যে। ব্রিটিশদের নিপীড়নমূলক মানসিকতা, ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার হয়ে ওঠার প্রবৃত্তি, দুর্বল জবাবদিহি ও অস্বচ্ছ প্রশাসনিক সংস্কৃতি পুলিশকে একটি অজনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ফলে তাকে জনবান্ধব করে গড়ে তোলা একটি বৃহৎ চ্যালেঞ্জ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, যা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
আমাদের সমাজে পুলিশের প্রয়োজন সীমাহীন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন, তদন্ত পরিচালনা, সড়কের নিরাপত্তা বিধান, দুর্যোগের সময় সহায়তা প্রদান, সমাবেশে শান্তি বজায় রাখা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, সাইবারজগতের অপরাধ প্রতিরোধসহ নানাবিধ কাজে পুলিশের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যদি পুলিশ না থাকে তবে সাধারণ মানুষ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, অসামাজিক ব্যক্তিবর্গ আরও বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত হবে, রাষ্ট্রের আইনকানুন কাগজে কলমে সীমিত হয়ে পড়বে।
একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পুলিশের প্রধান পরিচয় হবে, সে জনগণের সেবক। যে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে, তার নৈতিক ভিত্তি হবে জনগণের অধিকার রক্ষা। দরিদ্র কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী, সংখ্যালঘু, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাধারণ অভিযোগকারী, সবার সঙ্গে পুলিশের আচরণ হবে সমান মর্যাদাপূর্ণ। দল, মত, শ্রেণি, পেশা, ধনী, দরিদ্র তথা সামাজিক স্তরবিন্যাস অনুযায়ী যদি পুলিশের আচরণ বদলে যেতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। আমাদের মতো দেশে সরকারকে মানুষ চেনে তার পুলিশ প্রশাসন দিয়ে। সরকার যতই উন্নয়ন করুক, অবকাঠামো গড়ে তুলুক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করুক, তাতে কাজ হবে না। মানুষ যদি পুলিশ হেফাজতে গিয়ে অপমানিত হন, অভিযোগ করতে গিয়ে হয়রানিতে পড়েন, মামলায় টাকা লাগবে, এটা শোনেন, তাহলে সবকিছু বিফলে চলে যাবে। তারা যদি দেখেন শক্ত রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হতে থাকবে। মানুষ তখন আর রাষ্ট্রকে নিজের মনে করবে না। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহে জনগণের সঙ্গে পুলিশকে ভালো আচরণের নির্দেশনা দিয়েছেন।