বসুন্ধরা কিংস আবার ফুটবলের সিংহাসনে
এক মৌসুমের পর বসুন্ধরা কিংস আবার দেশের ফুটবলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। হাসি ফুটেছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত গুণমুগ্ধ ও ভক্তের মুখে। এই বিজয় সবার জন্য অনেক বড় স্বস্তি। ক্লাব ম্যানেজমেন্ট তাদের জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। সংকট মোকাবেলা করেছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কখনো আস্থা হারায়নি খেলোয়াড়দের ওপর।
বিশ্বাস করেছে দল হিসেবে কিংস মাঠে ঘুরে দাঁড়াবে। বাজে সময়টা কেটে যেতে সময় লাগবে না। খেলোয়াড়রা একটি দল হয়ে ‘জার্সির’ ইজ্জতের জন্য নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিয়ে লড়াই করেছেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে বিদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে একজনের সার্ভিস ছাড়া দল আর তেমন কাউকে পায়নি—তখন স্থানীয় খেলোয়াড়রা এই শূন্যতা পূরণ করেছেন সাফল্যের সঙ্গে।
তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন দলীয় সংহতি কী জিনিস। সম্মিলিত প্রচেষ্টা কিভাবে পারে একটি দলকে তার লক্ষ্যের বন্দরে পৌঁছে দিতে। লীগের দ্বিতীয় পর্বে কিংস তার বিদেশি কোচকেও আর পায়নি। তাঁর অনুপস্থিতিতে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর বায়েজিদ আলম জুবায়ের লিপু তাঁর সহযোগী কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানি ও মাহবুব হোসেন রক্সিদের নিয়ে দলকে শাণিয়ে উজ্জীবিত রেখেছেন—এটি একটি উদাহরণ যেকোনো ভালো ক্লাবের জন্য।
বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের পরিচালিত ক্লাবের মাধ্যমে শুধু মাঠে সাফল্য প্রত্যাশা করে না—তাদের আরেকটি লক্ষ্য হলো দেশের ফুটবলে কার্যকর অবদান রাখা। বাস্তবতায় এটি তো এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। আর এই কার্যকর ভূমিকা ক্রীড়াঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলজগতে কিংসের আধুনিক ফুটবল কাঠামো, ক্লাবের ব্যবস্থাপনা এবং খেলাবান্ধব চমৎকার পরিবেশ অন্যদের জন্য এখন অনুকরণীয়।
একটি খেলা হাতে রেখেই গত ১৫ মে কুমিল্লায় শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে আবাহনী লিমিটেডকে ২-০ গোলে পরাজিত করে বসুন্ধরা কিংস ষষ্ঠবারের মতো লীগ শিরোপা নিশ্চিত করেছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে প্রথমবারের মতো পেশাদার লীগ খেলতে নেমে আট বছরের মধ্যে (করোনা মহামারির জন্য খেলা পরিত্যক্ত হয়েছে ২০১৯-২০ সালে) ছয়বার শিরোপা জয় তো অসাধারণ সাফল্য। এর মধ্যে আবার একনাগাড়ে পাঁচবার শিরোপা জয় করে দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি। এর আগে অখণ্ড ভারতবর্ষের দিনগুলোতে প্রথমবার খেলতে নেমে মোহাম্মদ স্পোর্টিং ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে পাঁচবার লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
দেশে পেশাদার ফুটবল লীগ শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে। এর ১০ বছর পর এই লীগে খেলতে নেমে বসুন্ধরা কিংস প্রথম মৌসুম থেকেই দেশের ফুটবলে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জন্ম দিয়েছে নতুন ক্লাব সংস্কৃতির। পাল্টে দিয়েছে মাঠের ফুটবলের রূপরেখা ও গল্প। ফুটবলকে করেছে চিত্তাকর্ষক ও বেগবান। ফুটবলে ট্রেন্ডসেটার হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
মানুষ জিততে চায়। পরাজয় তার ভয়। বারবার মাঠে বিজয়ের সান্নিধ্য উপহার দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন বয়সের ফুটবল আমুদে মানুষ কিংসের ছায়াতলে এসেছে—তারা একসময় অন্য দলের সমর্থক ছিল। মাঠে কিংসের সৃষ্টিশীল ফুটবলের এটি বিজয় বললে ভুল হবে না।
আবাহনীর বিপক্ষে গত শুক্রবার জয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে ষষ্ঠবারের মতো লীগ শিরোপা। আর এতে কিংস আবাহনীর পেশাদার লীগ শিরোপা (ছয়বার) জয়ের রেকর্ডকে স্পর্শ করল। ফুটবলের পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, পেশাদার ফুটবলে কিংস আসার পর থেকেই গত কয়েক বছরে আবাহনী ও মোহামেডান ঘরোয়া ফুটবলের বিভিন্ন আসরে মোটেই সুবিধা করতে পারেনি। কিংস মাঠের লড়াইয়ে এদের অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে। তা সত্ত্বেও ক্লাব ফুটবল সংশ্লিষ্ট একটি দল এবং মিডিয়ার একটি অংশ—এই বিষয়ে সব সময় ভিন্ন ধরনের আচরণ করে চলেছে। বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একটি ক্লাব মাঠে নজর কাড়া ফুটবল খেলছে, দেশের ফুটবল উন্নয়ন এবং ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে—এটি তো দূষণীয় কিছু নয়।
কিংসের শিরোপা জয়ের পর কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, গত মৌসুমে যদি ক্লাবের শিরোপা হাতছাড়া না হতো, তাহলে ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। ফুটবলের সঙ্গে আছে জীবনের অদ্ভুত মিল। জীবনের সব হিসাব তো সব সময় মেলে না। ফুটবলেও ঠিক একই অবস্থা। মাঠে ভালো খেলোয়াড় গোল করতে পারেন না, কিন্তু সুযোগসন্ধানী খেলোয়াড় ঠিকই করেন। অদৃশ্যের এ আরেক খেলা।
আমার কাছে মনে হয়েছে, এবার যে ধরনের সার্বিক পরিস্থিতি—লাগাতার বিরুদ্ধাচরণ, হিংসা, বিদ্বেষ এবং পরিকল্পিত নেতিবাচক প্রচারণার বিপক্ষে লড়াই করে ক্লাব ম্যানেজমেন্ট খেলোয়াড়দের সর্বাত্মক সহযোগিতায় ট্রফি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে বিগত পাঁচবার লীগ শিরোপা জয় করতে এত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়নি।
বসুন্ধরা গ্রুপ প্রথম থেকেই চেয়েছে দেশের ফুটবল মাঠে পরিবর্তন। শুধু ক্লাব নয়, সব অংশীদার নিয়ে সমন্বিতভাবে ফুটবলের উন্নয়নে টেকসই ভূমিকা রাখতে। ফুটবলকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনতে। ফুটবল মাঠগুলোকে মুখর করতে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ক্লাব ফুটবল
- বসুন্ধরা কিংস