হামের সংক্রমণ : প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা ও সেবা

যুগান্তর নাভিদ সালেহ প্রকাশিত: ১৭ মে ২০২৬, ১১:২২

বাংলাদেশে গত মার্চ থেকে হাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে ৬০ হাজারেরও বেশি রোগী আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং ৪০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। সংখ্যাতাত্ত্বিক আলোচনা ও চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। এ লেখাটি তাই এ মুহূর্তে হাম প্রতিরোধ, সংক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা ও আক্রান্তদের জন্য কী করণীয়, তা নিয়ে অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু জরুরি বিষয়ের আলোকপাত করছে।


হামের মতো রোগের জীবাণু অত্যন্ত সংক্রমণপ্রবণ। তাই হাম প্রতিরোধ করতে গেলে টিকার প্রয়োগ শুধু দরকারি নয়, অত্যাবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোনো গোষ্ঠীর মাঝে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ রোগপ্রবণ জনসংখ্যার হামের টিকা নেওয়া থাকা দরকার। টিকা দেওয়ার হার এ পর্যায়ে থাকলে হার্ড ইমিউনিটি বা সামষ্টিক অনাক্রম্যতা তৈরি হয়। এ হার ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে গেলেই হার্ড ইমিউনিটির নিরাপত্তা চাদরে ছেদ পড়ে। তখনই সেই গোষ্ঠীর মানুষ অরক্ষিত হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন যে কোনো অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, যেমন আবদ্ধ ঘর, স্বাস্থ্য সেবালয়, স্কুল, কিংবা জনাকীর্ণ কোনো সমাবেশ এ রোগ সংক্রমণের পাদপীঠ হয়ে পড়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, শুধু এক বছর হামের টিকার ঘাটতি পড়লে, অর্থাৎ শুধু ২০২৫ সালে টিকার হার ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে ৯০ বা ৯২ শতাংশে নেমে গেলে, কীই বা এমন ক্ষতি হতে পারে? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় ২০১৯ সালে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সামোয়ায় হামের মহামারি থেকে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত সামোয়ায় হামের টিকার হার ছিল ৯৫ শতাংশ। ২০১৭ ও ২০১৮-এর শুরুর দিকে এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এক বছরের ভেতর হামের মহামারি দেখা দেয় এ দ্বীপরাষ্ট্রে। আক্রান্ত হয় ৫ হাজার ৭০০ দ্বীপবাসী। মৃত্যু ঘটে প্রায় ৮৩ শিশুর। মনে রাখা দরকার, এ রাষ্ট্রের মোট অধিবাসী ছিল মাত্র ২ লাখ। অর্থাৎ হামের টিকাজনিত হার্ড ইমিউনিটি এ রোগ প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধানতম নিরাপত্তা বেষ্টনী। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে সামোয়ার ২০১৯ সালের পরিস্থিতির দিকে যাত্রা করছে। এ মুহূর্তে হাম থেকে প্রতিরক্ষার উপায় কী? কোভিড মহামারির সময় তৈরি নিয়মাবলি কি যথেষ্ট? বলছি আরেকটি গল্প।


১৯৮২ সালের নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামে আক্রান্ত ৭ মাস বয়সি শিশুকে স্বাস্থসেবা দিলেন চিকিৎসক। এর প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর ৪ মাস থেকে আড়াই বছর বয়সি আরও তিন শিশুকে সেবা দেওয়া হয় সেই একই সেবালয়ে। পরের তিনজন শিশুর সঙ্গে প্রথম শিশুর সাক্ষাৎ হয়নি সেদিন, কখনো। অথচ ১ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের এ সেবালয় থেকে আক্রান্ত হলো পরের তিনটি শিশু। অর্থাৎ হামের জীবাণু ও এর বাতাসে ছড়ানোর প্রক্রিয়া অন্যান্য ভাইরাসের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। জার্নাল অব মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত নিবন্ধে বিখ্যাত মহামারি বিশেষজ্ঞ আরএইচ গান বলছেন, হাম সংক্রমণ কমাতে এ ভাইরাসের কার্যক্ষমতার সময়কাল এবং অভ্যন্তরীণ পরিবেশের বায়ু ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ খেয়াল দেওয়া জরুরি। অর্থাৎ আমরা যদি ধরে নিই, কোভিডের সংক্রমণ রোধের ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম এক্ষেত্রেও কার্যকর হবে, তাহলে তা পূর্ণ সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয় বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।


হামের ভাইরাসের বাহ্যিক আকার ইনফ্লুয়েঞ্জা বা কোভিডের জীবাণুর আকারের সঙ্গে তুলনা করা চলে। পার্থক্য হলো হামের ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতায়। অর্থাৎ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত একজন রোগী আরও এক বা দুজন, কোভিডে আক্রান্ত একজন, আরও ২ থেকে ৩ জনকে একই রোগে আক্রান্ত করতে সক্ষম। তবে হামে আক্রান্ত একজন রোগী থেকে একাধারে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ হামের ভাইরাসের সংক্রমণক্ষমতা ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে কমপক্ষে ১০ গুণ আর কোভিড ভাইরাস থেকে কমপক্ষে ৬ গুণ বেশি সংক্রমণপ্রবণ!


প্রশ্ন হচ্ছে, হামের ভাইরাসের আচরণগত বৈশিষ্ট্য কী? অন্যান্য ভাইরাস থেকে এর মূল পার্থক্য হলো, খুব অল্প পরিমাণ হামের জীবাণুও যদি বাতাসে ভেসে থাকে, যা অনেক লম্বা সময় পর্যন্ত ঘটতে পারে, তাহলে সেটুকুই এ রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট। আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের তেমন কোনো প্রয়োজন পড়ে না এ সংক্রমণের জন্য। তাই শিশুদের, বিশেষ করে ১৫ মাস বা তার কম বয়সি শিশুদের, এমন অভ্যন্তরীণ পরিবেশে রাখতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল রয়েছে। আক্রান্ত রোগী যে কোনো অভ্যন্তরীণ পরিবেশে কিছুক্ষণ থাকলেও সে পরিবেশ পরবর্তী প্রায় ২ ঘণ্টা হামের সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। তাই শুধু নিজ ঘরেই নয়, শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে গেলেও এ বিষয়ে খেয়াল রাখা দরকার। এবার আসি সংক্রমণ-পরবর্তী সেবায়। হামের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুরা, তবে বিশেষভাবে ১৫ মাস বা এর চেয়ে ছোট যারা, তারা। হাম হলে প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ সময় হামের প্রভাবে ভিটামিন এ-র কমতি ঘটে বা শিশুদেহে এর চাহিদা অত্যধিক বেড়ে যায়। কেন এমনটি ঘটে? হামের ভাইরাস শ্বাসতন্ত্র, পাকস্থলী বা অন্ত্র ও চোখসংক্রান্ত কলা বা টিস্যু আক্রমণ করে এবং এতে প্রদাহ তৈরি করে। আর তখন রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো ভিটামিন ‘এ’-এর চাহিদা বাড়িয়ে তোলে এ প্রদাহ সংবরণ করতে। তাই হামের শুরুর দিকে শিশুকে অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ প্রদান করা না গেলে এই রোগের তীব্রতা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। ফলাফল চোখের ক্ষতি, শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, এমনকি হাঁপানির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। আর যদি রোগ সংক্রমণের সময় শ্বাসক্রিয়ায় প্রদাহ খুব বেড়ে যায়, তাহলে নিউমোনিয়া রোগ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, যা হাম থেকে শিশুমৃত্যুর মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই পরিমাণমতো ভিটামিন এ দেওয়া রোগীর জীবন রক্ষার প্রথম ধাপ। এছাড়া অধিকমাত্রায় জলপান ও পুষ্টিকর খাবারের জোগান খুব জরুরি।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও