বিনিয়োগের বড় বাধা জ্বালানি সংকট ও আমলাতান্ত্রিক দেয়াল
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর আলোচনা বহুদিনের। প্রতিটি বাজেটের আগে, প্রতিটি বিনিয়োগ সম্মেলনের মঞ্চে, প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—“এফডিআই” বা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। কারণ সরকার জানে, শুধু দেশীয় বিনিয়োগ দিয়ে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সম্ভাবনার গল্প যত বড়, বিনিয়োগের বাস্তব চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক ছোট অর্থনীতিও যেখানে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, “জ্বালানি সংকট সমাধান করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে না।” একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ আনা শুধু বিডার একার দায়িত্ব নয়। সরকারের ভেতরে ছোট ছোট সরকার রয়েছে, যার কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।”
এই বক্তব্য কেবল একটি প্রশাসনিক মন্তব্য নয়; বরং বাংলাদেশের বিনিয়োগ বাস্তবতার নির্যাস। একজন কলামিস্ট হিসেবে মনে হয়, সরকার যদি সত্যিই বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তাহলে এখন আর শুধু সম্মেলন, স্লোগান কিংবা বিদেশ সফরে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, প্রশাসনিক সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বিনিয়োগকারীরা আসলে কী চান?
অনেক সময় আমরা মনে করি, কর ছাড় দিলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রথমেই তিনটি বিষয় বিবেচনা করেন—নীতিগত স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।
বাংলাদেশে এই তিন ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে।
ধরা যাক, একটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস কারখানা স্থাপন করতে চায়। তারা জমি পেল, প্রাথমিক অনুমোদনও পেল। কিন্তু এরপর শুরু হয় বাস্তব দুর্ভোগ। কখনও গ্যাস সংযোগ নেই, কখনও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা নেই, কখনও বন্দর থেকে কাঁচামাল ছাড় করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। আবার একটি অনুমোদনের জন্য এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।
অনেক বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার চেয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়াই বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কাগজে “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেটি “মাল্টি স্টপ ভোগান্তি”-তে পরিণত হয়।
জ্বালানি সংকট: বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অস্থিরতা
আশিক চৌধুরীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত জ্বালানি সংকট নিয়ে। কারণ একটি শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ঠিক রক্তসঞ্চালনের মতো। সেটি বন্ধ হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোডশেডিং এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিদেশি বিনিয়োগ