সারা বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী রাজনীতিতে যে নতুন নতুন স্লোগান নিয়ে আসে, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ স্লোগান সামনে এনেছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে নিয়ে আসে। মাঝখানে যে তিনটি একতরফা ও জবরদস্তির নির্বাচন হয়েছে, তাতে ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য স্লোগানের প্রয়োজন পড়েনি। কেননা, সেখানে ভোটাররা মুখ্য ছিলেন না।
সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী শাসনামলে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলেও সবার দিন যে বদল হয়নি, বর্তমান বাংলাদেশই তার প্রমাণ। মাথাপিছু আয় ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি সব সময় উন্নয়নের পরিমাপক নয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যখন দেখি দেশের এক–পঞ্চমাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং তাদের একাংশ জীবনধারণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন উন্নয়ন নামের শুভংকরের ফাঁকিটি ধরা পড়ে যায়।
এ প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের মনোযোগ কেড়েছিল বলেই তারা দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়েছে। কোনো দলের দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যেমন বিরাট সাফল্য, তেমন বিপদেরও কারণ হয়ে থাকে। অন্তত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তা–ই বলে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ভূমিকায় লেখা আছে, ‘জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে; সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে; আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে, সবার আগে বাংলাদেশ।’ আমরা আশা করি, এটা শুধু কথার কথা হবে না। বিএনপির নেতৃত্ব এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাইবে, যেখানে ধর্ম–বর্ণ–জাতিনির্বিশেষে সব মানুষ সমমর্যাদার অধিকারী হবে। দলীয়, ধর্মীয় বা নারী–পুরুষ পরিচয়ে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের মূল কথা ছিল বৈষম্যের অবসান। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনে সেই বৈষম্য না কমে আরও বেড়েছে। মব–সন্ত্রাস সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও প্রান্তিক করেছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর উপস্থিতি আরও কমেছে। দু–একটি উদাহরণ দিই।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়েছিল, সেই কমিশনে কোনো নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিল না। এই কমিশন যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বলেছেন। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেছেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলো যে সনদে সই করেছে, সেটা পুরুষ অধিকার রক্ষার দলিল।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের দুজন সদস্য শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমদ কমিশনের কাছে যে ভিন্নমত দিয়েছিলেন, তা ১১ মে প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা জাতির কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এবং কমিশনের দ্বিচারিতা তুলে ধরেছেন। অন্যান্য কমিশনেও নিশ্চয়ই দু–চারজন ভিন্নমত পোষণকারী সদস্য ছিলেন।
আর্থসামাজিক বিষয়ে রাষ্ট্রের যে বৈষম্যমূলক নীতি ও অনাচার চলে আসছে বহু বছর ধরে, সেসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন হাত দেয়নি। এমনকি রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ণ নিয়েও কিছু বলেনি। মতাদর্শের দিক থেকে পরস্পরবিরোধী দলগুলোকে এক টেবিলে বৈঠকে বসিয়ে সংস্কারের নামে কমিশন একটা গোঁজামিল দিয়েছে, যা সমস্যা সমাধানের বদলে নতুন সংকট তৈরি করেছে।
সবার আগে বাংলাদেশ করতে বিএনপি দুর্নীতি, বৈষম্য ও সন্ত্রাসের অবসান ঘটানোর কথা বলেছে। গণতান্ত্রিক কাঠামো সুদৃঢ় করার কথা বলেছে। কিন্তু সেটি বর্তমান আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে অনাচার চলছে, সেগুলো বহাল রেখে কি সম্ভব? যে অর্থনীতির সুফল সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষ পায় আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থাকে, সেই অর্থনীতি টিকিয়ে রেখে বৈষম্য কমানো যাবে না। আর বৈষম্য না কমলে দুর্নীতির বিস্তারও রোধ করা যাবে না।