গত ১৫ বছরে ব্যাংকগুলোর অবস্থার আশঙ্কাজনক হারে অবনতি হয়েছে। বলতে গেলে দেশের ব্যাংকব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে ব্যাংকগুলোকে টেনে তোলা প্রায় দুঃসাধ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অর্থনীতির শ্বেতপত্র থেকে কিছু তথ্য উল্লেখ করছি, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও গভীর সংকটে ফেলেছে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের যে আকার দাঁড়িয়েছে, তার পরিমাণ ১৪টি মেট্রোরেল অথবা ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের সমান।’ অর্থনীতির শ্বেতপত্র কমিটি আরও জানায়, ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। এরপরে রয়েছে ভৌত অবকাঠামো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। একের পর এক ঋণখেলাপি এবং শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেলেঙ্কারির কারণে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণ, ঋণ অবলোপন, ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন এবং স্টে অর্ডার বা মামলায় আটকে থাকা ঋণকে একসঙ্গে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ বলা হয়। শ্বেতপত্রের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে খেলাপি ঋণও রয়েছে।
এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার আর্থিক খাতের কতটা ক্ষতি করেছে। এখন ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হলে সরকার যেটা করতে পারে, সেটা হলো, প্রথমত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে এগুলোকে ফ্রেশ ক্যাপিটাল দিয়ে সরকারি মালিকানায় কিছু রেখে বাকিটা প্রাইভেটে দিয়ে চালাতে পারে। তবে এগুলোকে অবশ্যই লিস্টেড কোম্পানি হিসাবে রাখতে হবে, যাতে মানুষ এখান থেকে শেয়ার বাই সেল করতে পারে। এটি হলো একটা পথ, যেটা আগে থেকেই প্রক্রিয়াধীন ছিল। আরেকটি পথ হলো, এখন নতুন ফ্রেশ ক্যাপিটাল নিয়ে কেউ যদি সাহস করে এর উদ্যোগ নিতে চায়, নিতে পারে। আমার মনে হয় না কেউ এ ব্যাপারে ফ্রেশ ক্যাপিটাল নিয়ে এগিয়ে আসবে। কারণ, এসব ব্যাংকের এত দুর্নাম হয়েছে, এগুলোকে নতুন করে চালানো খুব একটা সুবিধা হবে না।
এবার ঋণখেলাপির বিষয়ে আসা যাক। ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থিতিভিত্তিক ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উচ্চ ঋণখেলাপির কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে ২৩ ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এসব ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এতে অধিকাংশ ব্যাংক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণ খেলাপি হলেও সে সময় তা হিসাব করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লুকানো এসব খেলাপি ঋণ ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে। এতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। খেলাপির বিপরীতে যে পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার দরকার ছিল, তাও রাখতে পারেনি এ ব্যাংকগুলো। এ সময় প্রভিশন ঘাটতি হয় ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। বিপুল প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে।
খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ যে হারে বাড়ছে, তাতে ব্যাংক খাতকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল। এখন খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে সামনে ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। সুতরাং খেলাপি ঋণের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক ঋণের যেগুলো কোলেটারেল হিসাবে রয়েছে, সেগুলো আইন-আদালতের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমাদের ব্যাংক আইনে ব্যবস্থা রয়েছে। আর যেগুলো কোলেটারেল হিসাবে নেই, সেগুলো তো বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। যত দুঃসাধ্যই হোক, পাচার হওয়া এসব অর্থ আমাদের ফেরত আনার চেষ্টা করতেই হবে। আর এসব ঋণখেলাপি পাচারকারীদের ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে ভুয়া কোম্পানি খুলে, ভুয়া ব্যবসা দেখিয়ে ব্যাংকগুলো একের পর এক লুট হয়েছে।
সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে নতুন করে আর কোনো ব্যাংক লুটেরা যাতে দাঁড়াতে না পারে। বর্তমানেও খেলাপি হয়েছে কিছু ঋণ। অবশ্য এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দার কারণেও হতে পারে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা হলে ঋণখেলাপির সংখ্যা এমনিতেই বেড়ে যায়। এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। এ ব্যাপারে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, সেটা হলো, বর্তমানে প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিটে কোনো ডিমান্ডই নেই। অর্থাৎ ঋণের কোনো চাহিদা নেই। ঋণের যদি চাহিদা না থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেবে কাকে? বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলোকে অলস টাকা ধরে রেখে বসে থাকতে হবে। এতে ব্যাংকব্যবস্থা আরও অবনতির দিকে যাবে।
সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমে গেছে। শুধু বর্তমান সরকার নয়, বা ইউনূস সরকারও নয়, পুরো অর্থনীতি আগে থেকেই খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এর লক্ষণ হচ্ছে, সরকারের বড় ঘাটতি বাজেট এবং সরকারের বিশাল আকারের সাইজ। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্প, বাণিজ্য ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটা কমে গেছে। শিল্প ও কলকারখানায় উৎপাদান কম হচ্ছে। বেকার সমস্যা বাড়ছে। সবমিলিয়ে দেশের অর্থনীতি একেবাবে স্থবির হয়ে গেছে। এ অবস্থা কাটানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হবে। তবে আমাদের দেশে চাহিদার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অধিক। সব ব্যাংককে একসঙ্গে চালানো সম্ভব নয়। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন কোন ব্যাংক রাখবে, কোন কোন ব্যাংক রাখা যাবে না।
শুধু ব্যাংকব্যবস্থাই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তা-ই নয়; একই সঙ্গে বিমা, লিজিং কোম্পানি, এনবিএফআই (নন ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন) সেক্টরের অবস্থাও ভালো নেই। খাদের কিনারে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে বেগবান করতে হবে। এখন কোন ফর্মুলাতে এসব প্রতিষ্ঠনাকে বেগবান করা হবে, সেটা সরকারকেই ঠিক করতে হবে। আর যেগুলো চলবে না এবং যেগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাস নেই, এমন প্রতিষ্ঠানকে না রাখাই শ্রেয়।
কয়েকটি ব্যাংক ভালো মুনাফা করেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রাহক দুর্বল ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে এদের কাছে রেখেছে। ফলে তারা ভালো মুনাফা করেছে। তবে মুনাফার প্রধান ক্ষেত্র ইন্টারেস্ট ইনকাম নয়। সাধারণত ব্যাংকের মুনাফা হয় ঋণ থেকে অর্জিত সুদ আয় থেকে। গত দুবছরে সেটা ছিল না। সরকারকে ঋণ দিয়ে, সরকার ট্রেজারি বন্ড ট্রেজারি বিল কেনার মাধ্যমেই ব্যাংকের মূল আয় হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। তবে এটা কোনো ভালো বা সুস্থ লক্ষণ নয়। প্রাইভেট সেক্টর ভালো ব্যবসা করতে পারছে না, অথচ সরকার ঋণপত্র কিনছে। সরকার ঋণ নিয়ে পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করছে। প্রকল্পে খুব সামান্যই যাচ্ছে। এজন্যই আমি প্রায়ই বলি, সরকারের সাইজ ছোট করতে হবে। পরিচালনা ব্যয় যদি এত বিশাল হয়, তাহলে উন্নয়ন বাজেটের জন্য সামান্য অর্থ পাওয়া যাবে। আর যদি উন্নয়ন অর্থনীতির পুরোটাই ঋণ করতে হয়, তাহলে দেশে ইনফ্লেশন হবে এবং টাকার মূল্যমান কমে যাবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- খেলাপি ঋণ
- অর্থনৈতিক সংকট