সংকটের অর্থনীতি ও উত্তরণের কৌশল
বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির পায়ে পায়ে সংকট। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের কিছু, আর পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অর্থনীতিকে’ আরো কঠিন করে যাওয়ার ক্ষত সংকটকে আরো তীব্র করেছে।
সব মিলিয়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি। মাত্র কয়েক বছর আগেও গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা দেশটি আজ সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকে অস্থিরতার সম্মুখীন। এই সংকটের গভীরতা বুঝতে গেলে শুধু বর্তমানের নেতিবাচক চিত্র দেখলেই হবে না, বরং তথ্যের ব্যবচ্ছেদ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতির হার এখন ১০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে বেশ অসহনীয় মাত্রা।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য মতে, নিত্যপণ্যের দাম গত দুই বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে পলিসি রেট বা নীতি সুদ হার কয়েক দফায় বাড়িয়ে কমবেশি ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে।
এর সরাসরি প্রভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার এখন ১৪-১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে। অর্থনীতির সাধারণ তত্ত্বে সুদহার বাড়লে বিনিয়োগ কমে যায়, যা এখন বাংলাদেশে স্পষ্ট। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে এসেছে, যা নির্দেশ করে যে উদ্যোক্তারা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনে সাহস পাচ্ছেন না।
ডলারের বিনিময় হার বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে দেখা দিয়েছে। দু-তিন বছর আগেও যে ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, তা এখন খোলাবাজারে ১২৫ থেকে ১২৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
এর ফলে আমদানিকারকদের এলসি বা ঋণপত্র খুলতে আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি ২৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও প্রকৃত আয়ের সঙ্গে তথ্যের গরমিল নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক অর্থনীতির স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে এবং অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের বিশাল ঘাটতি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে সংকটে ফেলেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হওয়ায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সর্বশেষ হিসাবে সরকার ব্যাংক থেকে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে টাকার প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। ব্যবসা প্রসার বা বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না। আবার সরকার ঋণ করে খরচ মেটাচ্ছে। বিনিয়োগ না হওয়া এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের বাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমঘন তৈরি পোশাক ও নির্মাণ খাতে কয়েক লাখ মানুষ গত এক বছরে কাজ হারিয়েছে বলে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দাবি। শিক্ষিত বেকারদের অবস্থা আরো করুণ।