‘ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন’ বাংলাদেশের জন্য কেন নতুন এক সম্ভাবনা
বাংলাদেশে অভিবাসন মানে হলো বিদেশে গিয়ে কাজ করা ও রেমিট্যান্স পাঠানো। বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে অভিবাসনের ধারণাও। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন মানুষ নিজ দেশে বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে পারছেন—যাকে বলা হচ্ছে ‘ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন’। গবেষক এ. অনীশ তাঁর বই ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন: দ্য প্রোগ্রামিং অব গ্লোবালাইজেশন-এ দেখিয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রম সীমান্ত পেরোচ্ছে, কিন্তু শ্রমিক নিজ দেশে থাকছেন।
এই পরিবর্তনের মূল শক্তি হলো ডিজিটাল অর্থনীতি ও অনলাইন শ্রমবাজার। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্কিং উইদাউট বর্ডারস: দ্য প্রমিস অ্যান্ড পেরিল অব অনলাইন গিগ ওয়ার্ক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের দেশ না বদলিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ দিচ্ছে। একইভাবে বিশ্ব শ্রম সংস্থা বা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) ‘ডিজিটাল লেবার প্ল্যাটফর্মস ইন কেনিয়া: এক্সপ্লোরিং উইমেন’স অপরচুনিটিস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অ্যাক্রস ভ্যারিয়াস সেক্টরস’ প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্ম এখন বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এই নতুন ব্যবস্থায় মানুষ বাস্তবেই আয় করছেন, এটি এখন আর কেবল ধারণা নয়। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ অট্টো ক্যাসি ও ভিলি লেহডোনভির্তা তাঁদের গবেষণা ‘হাউ ম্যানি অনলাইন ওয়ার্কার্স আর দেয়ার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ দেখিয়েছেন যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬৩ মিলিয়ন মানুষ অনলাইন শ্রম প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত। এর মধ্যে প্রায় ১৯ মিলিয়ন মানুষ বাস্তবে কাজ পেয়েছেন এবং অন্তত ৫ মিলিয়ন মানুষ উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। এই তথ্য আমাদের দেখায় যে ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন এখন একটি কার্যকর অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে উন্নয়নশীল দেশের মানুষও বৈশ্বিক আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
কোভিড-১৯ বিশ্বকে নতুন বাস্তবতা দেখিয়েছে
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন শ্রমবাজার অভিবাসনের ধারণা বদলে দিয়ে ‘ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন’কে বাস্তবে পরিণত করেছে আর কোভিড-১৯ মহামারি এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। মহামারির সময় অফিস ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কাজ থেমে থাকেনি; লাখ লাখ মানুষ ঘরে বসেই অনলাইনে কাজ করেছেন।
আইএলওর ‘আইএলও মনিটর: কোভিড-১৯ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক (২০২০–২১)’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময় বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন কর্মী লকডাউনের প্রভাবে পড়েছিলেন। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয় দূর থেকে কাজ চালানোর নতুন উপায় খুঁজতে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ দ্রুত জনপ্রিয় হয় এবং পরে এটি একটি স্থায়ী কাজের মডেলে পরিণত হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বুঝতে পারে, কর্মীদের বিদেশে না পাঠিয়েও কাজ করানো সম্ভব। ফলে তারা বিভিন্ন দেশের কর্মীদের অনলাইনের মাধ্যমে নিয়োগ দিতে শুরু করে। এতে শ্রমবাজার আরও উন্মুক্ত হয় এবং ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন বাস্তব কর্মসংস্থানের একটি শক্তিশালী পথে পরিণত হয়।
ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের পার্থক্য
এসব নতুন ধারণা নিয়ে একটি সাধারণ বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং ও ভার্চ্যুয়াল মাইগ্রেশন আসলে একই জিনিসের ভিন্ন নাম; কিন্তু বাস্তবে এই তিন ধারণা ভিন্ন স্তরে কাজ করে এবং তাদের কাঠামো, সম্পর্ক, প্রভাবও আলাদা।
প্রথমে যদি ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায়, এটি মূলত ব্যক্তিনির্ভর কাজের একটি পদ্ধতি। এখানে একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাছ থেকে কাজ নেন। এই কাজগুলো সাধারণত স্বল্পমেয়াদি, প্রজেক্টভিত্তিক ও অনিশ্চিত। একজন ফ্রিল্যান্সারের নির্দিষ্ট কোনো নিয়োগকর্তা থাকে না, ফলে তাঁকে সব সময় নতুন কাজ খুঁজে নিতে হয়। তাই এটি আয়ের একটি সুযোগ তৈরি করলেও স্থায়ী বা সংগঠিত শ্রমবাজারের সঙ্গে শক্ত সংযোগ তৈরি করে না।
অন্যদিকে আউটসোর্সিং একটি ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা, যেখানে কাজের স্থানান্তর হয় ব্যক্তি থেকে নয়, বরং একটি কোম্পানি থেকে আরেকটি কোম্পানির মধ্যে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের সফটওয়্যার উন্নয়ন বা কাস্টমার সার্ভিসের কাজ বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে। এই ক্ষেত্রে কর্মীরা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হন না; তাঁরা কাজ করেন একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে।