প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা জরুরি
বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের স্কুলে ভর্তির সময় মেধা যাচাই বা ভর্তি পরীক্ষা কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এই সিদ্ধান্তে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ স্বস্তি পেয়েছিলেন। কারণ ছোট শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমেছিল এবং ভর্তিপ্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবার এই পরীক্ষা চালুর আলোচনা সামনে আসায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের জন্য এই পরীক্ষা কতটা প্রয়োজন এবং এর প্রভাব তাদের মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশে কিভাবে প্রতিফলিত হয়? একই সঙ্গে একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে জীবনের পরবর্তী ধাপে অনেক ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি কোটা, আঞ্চলিকতা বা অন্যান্য বিবেচনা গুরুত্ব পায়, অথচ শিক্ষাজীবনের শুরুতেই শিশুদের কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়।
প্রাথমিক স্তরের শিশুরা শেখার একেবারে সূচনালগ্নে থাকে। এই সময় তাদের মনোজগৎ গড়ে ওঠে, কৌতূহল জন্মায়, ভাষা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশ পেতে শুরু করে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা যুক্ত হলে তা অনেক ক্ষেত্রেই এই বিকাশের গতিকে প্রভাবিত করে।
অনেক শিশু পরীক্ষার পরিবেশে ভীত হয়, অস্বস্তি বোধ করে এবং নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। এতে শেখার আনন্দ ক্ষুণ্ন হয়। শিক্ষা যদি শুরুতেই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা শিশুর মধ্যে শেখার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানকেও প্রভাবিত করে। শুধু তা-ই নয়, ছোট বয়সে এ ধরনের মানসিক চাপ শিশুদের আত্মবিশ্বাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
বিগত কয়েক বছর ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে দেখা গেছে, বিকল্প পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব এবং তা তুলনামূলকভাবে কম চাপপূর্ণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে লটারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অন্তত শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও অযথা প্রতিযোগিতার প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এতে পরিবারে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ কমেছে এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে বাস্তবতার একটি দিক উপেক্ষা করা যায় না। ভালো মানের স্কুলে আসনের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে একটি বাছাই প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। কিন্তু এই বাছাই যদি শিশুদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে আবাসিক এলাকা ভিত্তিক মানসম্মত স্কুলব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। যদি প্রতিটি এলাকায় সমমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে যাবে এবং ভর্তি নিয়ে অস্থিরতাও হ্রাস পাবে।
আবাসিক এলাকা ভিত্তিক স্কুলব্যবস্থার গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানকে দূরের নামি স্কুলে ভর্তি করাতে চান। কারণ কাছাকাছি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াত করতে হয়, যা শিশুদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। যানজটের কারণে সময় নষ্ট হয়, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পরিবারে অতিরিক্ত খরচ বাড়ে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে এই সমস্যা আরো প্রকট। যদি নিজ নিজ এলাকায় মানসম্মত স্কুল নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই সমস্যাগুলোর বড় অংশই কমে যাবে এবং শিশুদের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাথমিক শিক্ষা