পশ্চিমবঙ্গ: তৃণমূলই বিজেপির উত্থানের ‘সারথী’
অবশেষে রবার্ট ব্রুসীয় সূত্র ও সমীকরণে বঙ্গবিজয় করল ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি! উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব রাজ্যে বাঙালিরা বিশাল সংখ্যায় আছে, সেগুলোর প্রতিটিতেই এই সুবাদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ক্ষমতাসীন হলো তারা। ২০১৮-২০২৩ সালে ত্রিপুরা, ২০১৬-২০২১-২০২৬ সালে আসামের পর এবার পশ্চিমবঙ্গ জিতে ষোলকলা পূর্ণ করল কেন্দ্রীয় শাসক দলটি। এর ফলে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ভাগাভাগি করা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাঁচটির মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যই তাদের দখলে গেল।
আসামে ১২৬ আসনের মধ্যে গেল দুইবার যথাক্রমে ৮৬ ও ৭৫ আসন পাওয়া বিজেপির ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোট এবার ১০২টি আসনে জিতে আরও শক্ত খুঁটি গেড়েছে সেখানে। কিন্তু, আসামের এই বাড়তি প্রাপ্তিও ঢাকা পড়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের অভাবিত সাফল্যে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের পতন একদিন যেমন বিশাল খবর হয়ে উঠেছিল, বিজেপির পত্তন ঠিক তেমনই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বঙ্গের এমনই মহিমা!
২.
পশ্চিমবঙ্গে একটি বাদে ঘোষিত ২৯৩টির মধ্যে বিজেপি ২০৭টি ও বিদায়ী শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জিতেছে। অথচ, ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম রেজিমের অবসানকালে ১৮৪টি আসন নিয়ে যখন তৃণমূল ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপি একটি আসনও জেতেনি। পরের নির্বাচনে তৃণমূল ২১১টি আসন পেল, বিজেপি ৩টি আসন নিয়ে পড়েছিল এককোণে। গত ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের আসন বেড়ে হলো ২১৫টি, বিজেপিও একলাফে প্রধান বিরোধী দল হয়ে গেল ৭৭টি আসন পেয়ে। ঠিক পাঁচ বছর পর আজকে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল আসন সমীকরণে আবারও প্রায় সমানে সমান। তবে, ভোজভাজির মতো পাল্টে গেল শুধু দল দুটির নাম!
বিধানসভা হোক বা লোকসভা, যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বলার মতো কোনো অবস্থানই ছিল না মাত্র ১০-১৫ বছর আগেও, তারাই আজ ক্ষমতায়। কী করে এই পটপরিবর্তন ঘটল, সেই দীর্ঘ ইতিহাস বোঝাটা আজকের সময়ে অনাবশ্যক।
৩.
১৯৮০ সালে গঠিত হবার পর সর্বভারতীয় পার্টি হিসেবে বিজেপির উত্থান ঘটে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। পাঁচ বছর আগে মাত্র ২টি আসন পাওয়া বিজেপি ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ৮৫টি আসন পেয়ে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। মূলত অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলনে নির্বাচনি মেনিফেস্টোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানোয় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির জনপ্রিয় উত্থান ঘটে। এ সময় (১৯৮৬-১৯৯১) দলটির সভাপতি ছিলেন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নব্বইয়ের দশকে বিজেপি আরও বড় নির্বাচনি পার্টিতে পরিণত হয়। এই দশকে অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের তিনটিতেই তারা লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইতিহাসে কংগ্রেস ব্যতীত আর কোনো দলের এই রেকর্ড ছিল না। নব্বইয়ের দশকের প্রথমটিতে, অর্থাৎ, ১৯৯১ সালের আগাম নির্বাচনে ১২০টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পরের টার্মেই সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রধান দলে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি আজও একটি সর্বভারতীয় রেকর্ড।
এরপর, ভারতীয় রাজনীতিতে আসে অস্থিতিশীল সরকার এবং ঝুলন্ত লোকসভার কাল। তিন বছরে তিনবার নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় সে সময়। কাকতালীয় নাকি অলৌকিক, এ তিন নির্বাচনেই সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পেয়ে কংগ্রেস আসন সংখ্যায় দ্বিতীয় আর বিজেপি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পেয়ে আসন সংখ্যায় প্রথম হয়!
১৯৯৬ সালে ১৬১টি এবং ১৯৯৮ সালে ১৮২টি আসন পাওয়ার পরও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন সরকার টিকে থাকতে পারেনি। অবশেষে লোকসভার ৫৪৩টির মধ্যে ২৭২-এর ম্যাজিক নম্বর তারা অর্জন করে ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে। বিজেপি আবারও ১৮২টি আসন পায়, আর তাদের জোট এনডিএ ২৯৯টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বাজপেয়ির নেতৃত্বে। সে সুবাদে কংগ্রেসের বাইরে পাঁচ বছর পূর্ণ করা প্রথম ভারতীয় সরকারেও পরিণত হয় তারা।