সম্পদের স্বল্পতা থেকে সংঘাত : হোমার-ডিক্সনের তত্ত্বে বাংলাদেশ বিশ্লেষণ
বিশ্বব্যাপী সম্পদের স্বল্পতা ও সংঘাতের মধ্যে একটি সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করেন প্রখ্যাত কানাডীয় অধ্যাপক টমাস হোমার-ডিক্সন। তিনি তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘এনভায়রনমেন্ট, স্ক্রেসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স’-এ (১৯৯৯) যুক্তি দেন, পরিবেশগত সম্পদের স্বল্পতা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে, যা বিদ্রোহ, জাতিগত দাঙ্গা ও শহুরে অস্থিরতার মতো সহিংসতার রূপ নিতে পারে।
হোমার-ডিক্সন সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, সম্পদের স্বল্পতা ও সহিংসতার মধ্যে সম্পর্কটি প্রত্যক্ষ না হয়ে অত্যন্ত জটিল এবং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি কেবল একাডেমিক আবিষ্কার নয়, বরং বাংলাদেশের মতো সম্পদ-নির্ভর ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বর্তমান সংকট বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য বিশ্লেষণী হাতিয়ার।
হোমার-ডিক্সন সম্পদের স্বল্পতাকে তিনটি স্বতন্ত্র ভাগে বিভক্ত করেছেন: চাহিদাজনিত স্বল্পতা, জোগানজনিত স্বল্পতা এবং কাঠামোগত স্বল্পতা।
চাহিদাজনিত স্বল্পতা সৃষ্টি হয় যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা মানুষের ভোগের চাহিদা সম্পদের জোগানের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, জোগানজনিত স্বল্পতা আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন বা সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ কমে গেলে। তিনি এই তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করার জন্য মেক্সিকোর চিয়াপাস এবং বিভিন্ন আফ্রিকান ও এশীয় দেশের দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে পরিবেশগত স্বল্পতা ইতিমধ্যেই সহিংসতার জন্য দায়ী।
তবে, উন্নয়নশীল দেশের অস্থিরতার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো তৃতীয় ও সবচেয়ে জটিল রূপ—কাঠামোগত স্বল্পতা। এটি তৈরি হয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা। যাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তারা সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থা নিজেদের পক্ষে সাজিয়ে নেয়, যার ফলে সমাজের অধিকাংশ মানুষ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, গবেষকরা হোমার-ডিক্সনের এই কাঠামোটি সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় রোহিঙ্গা সংকট ও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণ করতে এই মডেল ব্যবহার করা হয়। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের (সিএইচটি) ভূমি ও সম্পদ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও এই তত্ত্বের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে ব্যাঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে, যা হোমার-ডিক্সনের স্বল্পতার তিনটি প্রকারেরই বাস্তব নিদর্শন বহন করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেল সংকট, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চরম আকার ধারণ করে, স্বল্পতার তত্ত্বের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
প্রথমত, চাহিদাজনিত স্বল্পতা স্পষ্ট। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে দেশের জ্বালানি তেলের ব্যবহার অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সূত্রে দেখা যায় মোট তেল ব্যবহার ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রায় ৫৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ।
এই চাহিদার বিপরীতে দেশের স্টোরেজ সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক আদর্শ যেখানে ৯০ দিনের মজুদের সুপারিশ করে, সেখানে বাংলাদেশ গড়ে ৪০ দিনেরও কম সময়ের জ্বালানি মজুদ রাখতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ কখনো কখনো মাত্র ১০ দিনের নিচে নেমে গেছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বিপুল চাহিদা ও দুর্বল সক্ষমতার মধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ জোগানজনিত স্বল্পতা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করে এমন গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি করুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং কিছু সময়ের জন্য তা ১৪০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ, যেটি তার শক্তির ৯৫ শতাংশই আমদানি করে, এই ধাক্কায় বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি পড়ে। এলএনজির দাম একক প্রতি ১২ ডলার থেকে বেড়ে ২৮ ডলারে পৌঁছায় এবং দেশকে জ্বালানি আমদানির জন্য প্রতিমাসে অতিরিক্ত প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছিল। এমনকি বৈদেশিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েও সংকট দূর করা যাচ্ছিল না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সম্পদ
- সংঘাত
- বাংলাদেশের অর্থনীতি