পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভার ২৯৩ আসনের ফল ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭ আসনে জিতে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। আগের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের আসন নেমে এসেছে ৮০টিতে।
বিজেপির এই বিশাল জয় একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তৃণমূলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা শাসনবিরোধী মনোভাব, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, নারীদের নিরাপত্তাসহ নানা ইস্যু। অন্যদিকে বিজেপির ছিল শক্তিশালী সংগঠন ও প্রচারযন্ত্র। এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে আদর্শিক সংহতি দিয়েছে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’। এটি অসন্তোষকে রূপ দিয়েছে একধরনের সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চিন্তাধারায়।
বিজেপি বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছে একটি রাজনৈতিক আয়না হিসেবে, যেখানে ভোটারদের সামনে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন তুলে ধরা হয়েছে—হিন্দু বনাম মুসলিম, শরণার্থী বনাম অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর এই বয়ানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাভীতির অনুভূতি তৈরি করেছে।
এই বয়ানকে বিজেপি তিনভাবে কাজে লাগিয়েছে—সিএএর মাধ্যমে শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে তৃণমূলকে অভিযুক্ত করে এবং সীমান্ত ও নাগরিকত্ব প্রশ্ন সমাধানে নিজেদের একমাত্র কার্যকর শক্তি হিসেবে তুলে ধরে।
মতুয়া সম্প্রদায় এই রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল। তৃণমূল কল্যাণমূলক সুবিধা দিয়ে তাদের পাশে রাখতে চাইলেও বিজেপি নাগরিকত্বকে ‘ঐতিহাসিক ন্যায়ের’ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে তাদের আকৃষ্ট করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনও এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির এই বয়ানকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করলেও, তাঁর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় কাটাতে পারেনি।
সব মিলিয়ে, ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ বিজেপিকে স্থানীয় সমস্যা থেকে বড় জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের বয়ান তৈরি করতে সাহায্য করেছে। ফলে হিন্দু ভোটারদের একত্রীকরণ হয়েছে এবং তৃণমূল একটি দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে।