বালু আর সন্ধ্যা দুই শীর্ণকায়া নদীর কান্না
রাজধানী ঢাকার পাশ দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বয়ে চলমান বালু আর বরিশালের পাশে সন্ধ্যা নদী। এই দুই নদী যেন আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া উচ্ছল শৈশব-কৈশোর জীবনের প্রতীককে উপহাস করছে। একসময় এরা ছিল প্রবাহমান, প্রাণবন্ত; আজ তারা শীর্ণকায়া, মৃতপ্রায়, দুই নদীর মতো নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বালু নদী, ঢাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত, একসময় ছিল স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস। কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ—সবকিছুর সঙ্গে এই নদীর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে বরিশাল অঞ্চলের সন্ধ্যা নদীও ছিল তেমনি প্রাণবন্ত। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বহু জনপদ, বাজার, সংস্কৃতি। কিন্তু আজ এই দুই নদীর অবস্থা যেন একই গল্পের ভিন্ন অধ্যায়, যা দূষণ, দখল আর অব্যবস্থাপনার এক নির্মম কাহিনি।
বালু নদীর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। শিল্পকারখানার বর্জ্য, নগরীর ময়লা-আবর্জনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই নদীকে প্রায় মৃত করে ফেলেছে। পানির রং কালো, দুর্গন্ধযুক্ত; জীববৈচিত্র্য প্রায় বিলুপ্ত। নদীর বুক ভরাট হয়ে গেছে বালু আর ময়লার স্তূপে। বালু নামটি যেন এখন আর কেবল একটি নাম নয়, এটি হয়ে উঠেছে নদীর বাস্তব চিত্র।
একইভাবে সন্ধ্যা নদীও আজ সংকটাপন্ন। অতিরিক্ত বালু উত্তোলন, নদীভাঙন এবং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়ার ফলে এই নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, কোথাও কোথাও সন্ধ্যা নদী এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে বর্ষা ছাড়া সেখানে পানির অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুকে হাঁটা যায়, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল।
এই দুই নদীর দুর্দশার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে। সেগুলো হচ্ছে: ক্রমাগত দখল, দূষণ এবং নীতিগত ব্যর্থতা। প্রথমত, নদী দখল একটি বড় সমস্যা। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নদীর তীর দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয়ত, দূষণ—শিল্পবর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নদীগুলোকে বিষাক্ত করে তুলছে। তৃতীয়ত, নীতিগত ব্যর্থতা: নদী রক্ষায় যে আইন ও নীতি রয়েছে, তার কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে।
এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। জেলেরা মাছ পাচ্ছে না, কৃষকরা সেচের পানি পাচ্ছে না, নৌ-পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। প্রথমত, নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দূষণকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে; মানুষকে বুঝতে হবে যে নদী রক্ষা মানেই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নেতিবাচক প্রভাব
- নদী রক্ষা