পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন : অশনিসংকেত
বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুন। আইনসভার পূর্বাংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম লীগের জনপ্রতিনিধিরা সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানভুক্ত করার পক্ষে রায় দেন। কিন্তু বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম অংশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ৫৮-২১ ভোটে পশ্চিম অংশকে ভারতভুক্তির পক্ষে রায় দেয়। এর ফলে বঙ্গভঙ্গ হয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ সৃষ্টি হয়। ৩ জুলাই, ১৯৪৭-এ ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘পশ্চিমবঙ্গের’ প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, যার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। আগস্ট মাসে ব্রিটিশ বাংলা প্রেসিডেন্সি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হলে দুটি স্বাধীন সত্তার জন্ম হয়। মুসলমানপ্রধান পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তানের পূর্ব বাংলা প্রদেশ (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান) এবং হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য।
প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী : ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস থেকে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সরকারের প্রধানকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে অভিহিত করা হতো। তারপর ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ শব্দটি চালু হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাত্র পাঁচ মাস ওই পদে আসীন ছিলেন। এরপর তারই সহকর্মী ডা. বিধানচন্দ্র রায় তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত টানা ১৪ বছর প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ১ জুলাই, ১৯৬২-এ তার মৃত্যুর পর চলতি বিধানসভার অবশিষ্ট মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন, তিনি ১৯৬২ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনি বাংলা কংগ্রেসের নেতা হিসাবে ১ মার্চ, ১৯৬৭ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন এবং ২১ নভেম্বর ১৯৬৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৭ সালের শেষদিকে কিছু সময়ের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের অস্থিরতা : এরপর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুকালের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির রাজনৈতিক অধ্যায় হিসাবে গণ্য করা হয়। জোট সরকার এ সময় ক্ষমতায় আসে। মতবিরোধের কারণে সরকার বারবার ভেঙে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী), কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ১৯৬৭ সালে শুরু হয় রাজ্যে সহিংসতা ও অস্থিরতা এবং এর মধ্যে উগ্রবাদীদের উন্মেষ ঘটে। বিধায়কদের (এমএলএ) বারবার দলবদলের কারণে সরকারের আয়ুষ্কাল সীমিত হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের কারণে রাজ্যে বিরোধী জোট বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
বিপ্লবীরা সামনে আসে : এ অবস্থায় ১৯৬৯ সালের ১ মে (মে দিবস) কলকাতার ময়দানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা গঠনের ঘোষণা দেন কানু সান্যাল। চারু মজুমদার এ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রধান তাত্ত্বিক নেতা নিযুক্ত হন। এরপর পার্টি গোপন (আন্ডারগ্রাউন্ড) রাজনীতি শুরু করে। নবগঠিত এ পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মাও সে তুং-এর চিন্তাধারা) অনুসরণ করতে থাকে। চীনের বিপ্লবের আদলে ভারতে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন এ পার্টির বিপ্লবী নেতারা।
সরকারের মধ্যে আতঙ্ক : এ আন্দোলনের কারণে ভারতের তৎকালীন শাসকরা ‘আর্বান নকশাল’ বা নকশালবাদী আন্দোলনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ঠিক এ সময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থী পশ্চিম বঙ্গে আশ্রয় নিলে কংগ্রেস সরকার নিশ্বাস নেওয়ার সময় পায়। আতঙ্কিত কংগ্রেস সরকারের তীব্র দমনপীড়নের মুখে পড়ে পার্টি। হাজার হাজার তরুণ মেধাবী নেতা কর্মীকে হত্যা করে হুগলি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ (সিআরপি)-এর অত্যাচারের কাহিনি আজও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দেয়। এ ভয়াবহ দমন-পীড়ন নিয়ে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন ‘ক্যালকাটা ৭১’ নামের ছায়াছবি নির্মাণ করেন। ১৯৭২ সালে পুলিশ চারু মজুমদারকে গ্রেফতার করে। পুলিশ লক-আপে চারু মজুমদারের মৃত্যু হয়। চারু মজুমদারের মতাদর্শ ভারতের বামপন্থি রাজনীতিতে একটি আমূল পরিবর্তনবাদী ধারার জন্ম দিয়েছিল, যা আজও নকশালবাড়ি আন্দোলন হিসাবে পরিচিত হয়ে আছে এবং ভারতের ১১টি রাজ্যে তারা সক্রিয় রয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অশনি সংকেত
- বিধানসভার নির্বাচন